Abdullah Ibn Mahmud's Channel
6.02K subscribers
91 photos
1 video
14 links
Download Telegram
আবু বুরদা (রা) নামের একজন সাহাবী ছিলেন। ঈদুল আযহার কুরবানির একটি বিশেষ নিয়ম তার একটি ভুলের কারণে মানুষ আরও নিশ্চিতভাবে জানতে পারে। তার পুরো নাম আবু বুরদা ইবনে নিয়ার। মদিনার হারিসা গোত্রের বিশ্বস্ত এক আনসারী সাহাবী। যে ঈদের ঘটনা বলছি, সেটা যে কবে আমরা নিশ্চিত জানি না। তবে, ৬২৪ সাল অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরি সালের ঘটনা হতে পারে, কারণ ওই সময়ই কুরবানি ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব হয়। নতুন নতুন বিধায় অনেকেরই তখন নিয়মকানুন পুরোপুরি না জানা অস্বাভাবিক নয়।

তো, সেদিন ঈদুল আযহার সকালবেলা।

সকাল সকালই আবু বুরদা (রা) মেহমান ও পরিবারকে খাওয়ানোর ব্যাকুলতা থেকে নিজের ছাগলটি জবাই করে ফেললেন। তিনি বেশ দানশীল আর পরিবারপ্রেমী মানুষ ছিলেন। তবে খুব একটা ধনী ছিলেন না।

বাসায় কুরবানি করে আবু বুরদা (রা) গেলেন ঈদের নামাজ পড়তে। নামাজ পড়ানো শেষ করে নবীজি (সা) ঘোষণা করলেন, “যে ব্যক্তি নামাজের আগে কুরবানি করেছে, সেটা কেবলই গোশত হিসেবে গণ্য হবে (অর্থাৎ কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে না)।”

এ কথা শুনে তো আবু বুরদা (রা) চিন্তায় পড়ে গেলেন। এখন তিনি কী করবেন? কুরবানির জন্য ন্যূনতম যে বয়সের পশু দরকার, এমন তো আর কোনো পশুই তার কাছে বাকি নেই। তাহলে কুরবানি দেবেন কী করে?

তিনি নবীজি (সা)-এর কাছে গেলেন। বিনয়ের সাথে বললেন, “আল্লাহর রাসূল! আমি ভেবেছিলাম আজ খাওয়াদাওয়ার দিন। তাই আমি নামাজের আগেই জবাই করেছি যেন আমার পরিবারের লোকজন ও প্রতিবেশীরা দ্রুত খেতে পারে। কিন্তু এখন তো আমার কাছে কুরবানি করার মতো পূর্ণ বয়সের আর কোনো পশুই নেই। তবে, আমার কাছে একটা ছয় মাস বয়সের ছাগলছানা আছে, ওটা আমার কাছে দুটো পূর্ণবয়স্ক ছাগলের চেয়েও বেশি প্রিয়। আমি কি ওই ছাগলছানা কুরবানি করতে পারি?”

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়স না হলে কুরবানি জায়েজ হয় না। ছাগলের ক্ষেত্রে সেটা এক বছর, উটের পাঁচ বছর, গরুর দু বছর, ইত্যাদি। সেই হিসেবে ওই ছাগল দিয়ে কুরবানি জায়েজ হবার কথা না। কিন্তু আবু বুরদা (রা)-র আন্তরিকতা দেখে নবী (সা) তার জন্য এক ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমী অনুমতি দিলেন। বললেন, “হ্যাঁ, তুমি এটাই জবাই করো। তবে মনে রেখো, তোমার পরে আর কারো জন্য এই বয়সের পশু দিয়ে কুরবানি করা জায়েজ হবে না।”

নবী (সা)-এর অনুমতিক্রমে আবু বুরদা (রা) সেই ব্যতিক্রমী কুরবানিই করলেন। (ঘটনাটি সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে রয়েছে)

জুনদুব (রা) নামের আরেক সাহাবীও একইরকম ভুল করেছিলেন। তিনি অবশ্য ভুল বোঝার সাথে সাথেই বাসায় গিয়ে আরেকটি ভেড়া কুরবানি করে ফেলেন।

আবু বুরদা (রা)-র ঘটনা থেকে এ নিয়ম পরিষ্কার হয়ে যায় যে, স্থানীয় ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার আগে কোনো পশু কুরবানি করা যায় না। এই আনসারী সাহাবী সিফফিনের গৃহযুদ্ধের সময় আলী (রা)-র পক্ষে যুদ্ধ করেন। পরবর্তীতে আমিরে মুয়াবিয়া (রা)-র শাসনামলে আবু বুরদা (রা) মদিনাতেই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন।

[দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা রয়েছে একটি ভিন্ন আঙ্গিকের সহজ একটি সীরাত লিখে শেষ করার, যেখানে মানুষের কম জানা ঘটনাগুলোও থাকবে। কিছু নমুনা আমার একাধিক বইতে পাঠক পড়ে থাকতে পারেন, অনেকে এ নিয়ে মেসেজও দিয়ে থাকেন, কবে বেরুবে; উত্তর হলো, জানি না। এ সীরাতের জন্য বিভিন্ন ছোটখাটো ঘটনা সামনে পেলেই সংরক্ষণ করে রাখি, যেবছরই বের হোক না কেন, ইনশাআল্লাহ। ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে ঈদের ঘটনা উল্লেখ করলাম, আরও কিছু সংশ্লিষ্ট ঘটনা আছে, লিখতে পারি। অপেক্ষায় থাকুন।]
❤46⚡1
মদিনার ইতিহাসের কঠিন এক ঈদ। কুরবানির ঈদ। তখন ৬৩০ সাল, নবম হিজরি। চরম পরীক্ষার বছর। তীব্র দাবদাহের মধ্যে তাবুক যুদ্ধ শেষ করে সাহাবীরা যখন মদিনায় ফিরলেন, তখন প্রায় সবার হাত খালি, মদিনার অর্থনৈতিক ও খাদ্য মজুদও প্রায় শেষের দিকে। ঠিক এই ক্লান্তিকর সময়েই ঘনিয়ে এলো ঈদুল আযহা।

কিন্তু ঈদের আমেজ শুরুর আগেই মদিনা সীমান্তে দেখা দিল আরেক বিপর্যয়! আরবের ভেতরের বিস্তীর্ণ মরুভূমি অঞ্চলে তীব্র খরা আর দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ায়, দলে দলে ক্ষুধার্ত ও সর্বস্বান্ত যাযাবর বেদুইন পরিবারগুলো খাবারের সন্ধানে মদিনার উপকণ্ঠে এসে আশ্রয় নিয়েছে।

এমন ভয়াবহ সংকটের মুখে নবী (সা) ঈদুল আযহার দিন সকালে মদিনাবাসীদের জন্য একটি আকস্মিক নির্দেশ জারি করলেন। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে আমরা নবীজি (সা)-এর সেই নির্দেশটি পাই, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরবানি করবে, সে যেন তিন দিনের পর তার ঘরে কুরবানির মাংসের আর কিছুই বাকি না রাখে।”

সাহাবীরা নিজেদের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও নিঃশর্তভাবে এই নির্দেশ মেনে চললেন। নিজেরা তিন দিনে যতটুকু পারলেন খেলেন, আর বাকি সবটুকু ক্ষুধার্ত ও আশ্রয়হীন বেদুইনদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন। নিজেদের ঘরে এক টুকরো মাংসও জমিয়ে রাখলেন না। সেবারের মতো শরণার্থী সংকট চমৎকারভাবে কেটে গেল।

এর পরের বছর, অর্থাৎ ১০ম হিজরি সনে (৬৩১ খ্রিস্টাব্দ) পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল। আরব ভূখণ্ডের দুর্ভিক্ষ কেটে গেছে, মদিনার অর্থনৈতিক অবস্থাও স্বাভাবিক। এ বছরটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত আবেগঘন, কারণ এই জিলহজ্ব মাসেই নবী (সা) তাঁর জীবনের শেষ হজ্ব বা ‘বিদায় হজ্ব’ সম্পন্ন করেন।

ঈদের দিন কুরবানি করার সময় একদল সাহাবী নবী (সা)-এর কাছে এসে কিছুটা দ্বিধা ও উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি এবারও গত বছরের মতোই করব?” অর্থাৎ তারা ভাবছিলেন, এবারও কি তিন দিন বাদে সব গোশত বিলিয়ে দেবেন?

সাহাবীদের জিজ্ঞাসার উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, “এখন তোমরা নিজেরা খাও, অন্যদের খাওয়াও। চাইলে জমাও করে রাখতে পারো। গত বছর আমি তোমাদের কেবল এই কারণেই নিষেধ করেছিলাম যেন তোমরা মদিনায় আসা ওই অভাবী ও ক্ষুধার্ত মানুষদের সাহায্য করতে পারো।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৭১]

তখন থেকে আবারও সবাই স্বাভাবিকভাবেই কুরবানি করতে লাগলো। ওই নিয়মটি আগের বছরের মদিনাবাসীদের জন্যই ছিল কেবল।

#টুকরো_ইতিহাস ৩
❤51
উমাইয়া খলিফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক তখন ক্ষমতার চূড়ায়। জমকালো রাজকীয় শানশওকত আর বিশাল সৈন্যসামন্ত পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি যখন পবিত্র হজ্ব পালন শেষে মদিনায় প্রবেশ করলেন, তখন খলিফার এই রাজকীয় জাঁকজমক দেখে চারপাশের মানুষজন ভয়ে আর শ্রদ্ধায় পথ ছেড়ে দিচ্ছিল। ঘটনাটি ৭১৬ খ্রিস্টাব্দের।

মদিনায় পৌঁছে খলিফা সুলাইমান উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, "এখানে কি এমন কোনো ব্যক্তি আছেন, যিনি আল্লাহর রাসুল (সা)-এর কোনো সাহাবীর সান্নিধ্য লাভ করেছেন?"

লোকেরা তাকে মদিনার প্রখ্যাত ও স্পষ্টভাষী তাবেঈ আবু হাজেমের কথা বললেন, যার আসল নাম সালামা বিন দিনার। খলিফার আহ্বানে আবু হাজেম রাজদরবারে উপস্থিত হলেন। খলিফা সুলাইমান তাকে সমীহ করে কুশল বিনিময় করলেন, কিন্তু আবু হাজেমের খোদাভীরু চোখে খলিফার চারপাশের এই পার্থিব অহংকার ও দুনিয়াদারির জাঁকজমক ভালো ঠেকলো না।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে খলিফা সুলাইমান আফসোসের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, "আবু হাজেম! আমাদের কী এমন হলো যে, আমরা মৃত্যুকে এতো অপছন্দ করি?"

আবু হাজেম শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "কারণ, আপনারা আপনাদের দুনিয়াকে আবাদ করেছেন আর পরকালকে করেছেন ধ্বংসস্তূপ। তাই আবাদ করা ঘর ছেড়ে এই ধ্বংসস্তূপে যেতে আপনাদের মন সায় দেয় না।"

খলিফা সুলাইমান স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে আগামীকাল আল্লাহর দরবারে আমাদের হাজিরা কেমন হবে?"

আবু হাজেম বললেন, "আমিরুল মুমিনিন! আপনাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল, তাদের আল্লাহর দরবারে আগমন হবে ঠিক তেমন, যেমন কোনো দীর্ঘ প্রবাসী ব্যক্তি বড়ই আনন্দের সাথে নিজ ঘরে তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে। আর আপনাদের মধ্যে যারা পাপাচারী, তাদের উপস্থিতি হবে ঠিক তেমন, যেমন কোনো পালিয়ে যাওয়া গোলামকে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে ধরে এনে তার কঠোর মালিকের সামনে দাঁড় করানো হয়!"

একথা শুনে খলিফা সুলাইমান কেঁদে ফেললেন, ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, "আহ! তাহলে আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য কী রয়েছে?"

আবু হাজেম বললেন, "আপনার কাজকর্মকে আল্লাহর কিতাবের আয়নায় ধরুন, তবেই উত্তর পেয়ে যাবেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, নিশ্চয়ই পুণ্যবানরা থাকবে পরম নেয়ামতে, আর পাপাচারীরা থাকবে জাহান্নামে।" [সূরা ইনফিতার ৮২:১৩-১৪]

খলিফা সুলাইমান ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তাহলে আল্লাহর দয়া কোথায়?"

আবু হাজেম বললেন, "আল্লাহর দয়া সৎকর্মশীলদের অতি নিকটবর্তী।"

এরপর খলিফাকে তার পূর্বসূরিদের রাজকীয় অহংকারের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবু হাজেম বললেন, "আপনার পূর্বপুরুষেরা বহু মানুষকে হত্যা করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। এখন ভেবে দেখুন, আজ অন্ধকার কবরে তাদের কী অবস্থা হচ্ছে! মনে রাখবেন, একদিন আপনাকেও এই সব সৈন্যসামন্ত আর সালতানাত ফেলে একাকী একটি সংকীর্ণ কবরে গিয়ে শুতে হবে। সেদিন আপনার এই দুনিয়াজোড়া ক্ষমতা কোনো কাজে আসবে না।"

বিশাল সাম্রাজ্যের খলিফা, যার এক ইশারায় মানুষের গর্দান যেত, তিনি এই সাধারণ প্রবীণ বুজুর্গের মুখে পরকালের এমন কঠিন সত্য শুনে ভেঙে পড়লেন। রাজকীয় অহংকার চূর্ণ হয়ে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তার কান্নার আওয়াজে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল।

[উৎস: ইমাম ইবনুল জাওযি রচিত 'সিফাতুস সফওয়াহ'।]

আবু হাজেম ছিলেন প্রবল দুনিয়াবিমুখী, তাই তিনি তার বিখ্যাত উপদেশে বলেন, ​"আমি আমার রিজিকের ব্যাপারে চড়ুই পাখির মতোই নিশ্চিন্ত। চড়ুই কি আগামীকালের রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা করে? সে তো আল্লাহর ওপর ভরসা করে সকালে খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। মানুষের আফসোস, সে খলিফা বা রাজার দরবারের চেয়ে আল্লাহর ভাণ্ডারের ওপর ভরসা কম রাখে!"

#টুকরো_ইতিহাস ৪
❤29🔥5⚡1
আব্বাসীয় খলিফা আব্দুল্লাহ আল-মামুন তখন বাগদাদের মসনদে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি তার অনুরাগ ছিল অন্যরকম। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি প্রাচীন সব মূল্যবান বই ও নথি সংরক্ষণ করার জন্য তিনি বাগদাদে একটি রাজকীয় লাইব্রেরি ও আর্কাইভ গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা জ্ঞানঘর নামে পরিচিত। সময়টা ছিল খ্রিস্টীয় ৮৩০ সালের কাছাকাছি।

তৎকালীন বাইজান্টিন সাম্রাজ্যের সম্রাট থিওফিলাসের সাথে সাথে খলিফা মামুনের বেশ কয়েকবার যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে রোমানরা পরাজিত হয়ে যখন খলিফার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়, তখন খলিফা মামুন রাজদরবারে বসে এক অনন্য সিদ্ধান্ত নেন। সবাই ভাবছিল খলিফা হয়তো বিপুল পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা, হীরা-জহরত কিংবা নতুন কোনো রাজ্য দাবী করবেন।

কিন্তু খলিফা মামুন বাইজান্টিন দূতের সামনে এক আজব শর্ত রাখলেন। তিনি বললেন, "আমার কোনো ধন-সম্পদ লাগবে না। রোমান সম্রাটের রাজকীয় সংগ্রহে ক্লডিয়াস টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রন্থ 'আলমাজেস্ট’সহ গ্রিক বিজ্ঞান ও দর্শনের কিছু আদি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। সেই প্রাচীন বইগুলো যদি তোমরা বাগদাদে পাঠানোর ব্যবস্থা করো, তাহলেই আমি এই সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করব।"

দূতের কাছ থেকে বাইজান্টিন সম্রাট এই শর্ত শুনে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতেই পারেননি যে কেউ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোনো জমি বা সোনা-দানা না চেয়ে কেবল কিছু পুরনো বইয়ের মালিকানা দাবি করতে পারেন! সম্রাট দেরি না করে সেই মহামূল্যবান পাণ্ডুলিপিগুলো বাগদাদে পাঠিয়ে দিলেন। সন্ধি হয়ে গেল।

বাগদাদের রাজকীয় আর্কাইভে এই বইগুলো আসার পর একদল দক্ষ পণ্ডিত সেগুলো আরবিতে অনুবাদ করার কাজে নিয়োজিত হন। খলিফার ব্যক্তিগত আগ্রহ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই এই বড় মাপের অনুবাদ কর্মটি সম্পন্ন হয়েছিল। এই খলিফা মামুন (৮১৩-৮৩৩) ছিলেন সপ্তম আব্বাসীয় খলিফা, তার পিতা ছিলেন বিখ্যাত খলিফা হারুনুর রশিদ। কথিত আছে, যে পণ্ডিত যতটুকু অনুবাদ করতে পারতেন, খলিফা মামুন তাকে সেই গ্রন্থের অনূদিত অংশের ওজনের সমপরিমাণ সোনা উপহার দিতেন। যুদ্ধজয়ের পর সোনা-দানা না চেয়ে জ্ঞান ও বই দাবি করার এমন রাজকীয় নজির ইতিহাসে বিরল।

[উৎস- ফিলিপ হিট্টির 'হিস্ট্রি অব দি অ্যারাবস', ইবনে আল-নাদিমের 'কিতাবুল ফিহরিস্ত']

#টুকরো_ইতিহাস ৫
❤29
২ জুন। আজকের মতোই সেদিন একই তারিখ ৭১৪ খ্রিস্টাব্দের। ইরাকের ওয়াসিত শহরের এক অন্ধকার রাজকীয় কক্ষে শুয়ে ছটফট করছেন এক ব্যক্তি। প্রচণ্ড পেট ব্যথায় তার শরীর দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। শরীরের ভেতর তীব্র শীত অনুভবের কারণে চারপাশ বড় বড় উনুনে আগুন জ্বালিয়েও তার কাঁপুনি থামানো যাচ্ছে না। এই ব্যক্তিটি আর কেউ নন, উমাইয়া খিলাফতের সবচেয়ে প্রতাপশালী, বাগ্মী এবং একই সাথে চরম নির্মম ইরাকি গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নাম শুনলে তৎকালীন মক্কা, মদিনা আর ইরাকের মানুষের বুক কেঁপে উঠত। উমাইয়া খিলাফতের ভিত শক্ত করতে তিনি যে পরিমাণ রক্তপাত ঘটিয়েছেন, ইতিহাসে তার জুড়ি মেলা ভার। কাবা প্রাঙ্গণে পাথর নিক্ষেপ করা থেকে শুরু করে প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা)-র শাহাদাত ও তার মৃতদেহকে শূলে চড়ানো, সবকিছুর পেছনেই জড়িয়ে ছিল তার নাম।

কিন্তু মৃত্যুর ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে তার জীবনে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। তৎকালীন বিখ্যাত ও প্রবীণ তাবেঈ সাঈদ বিন জুবায়েরকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার নির্দেশ দেন, তখন সাঈদ জল্লাদের তলোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় আল্লাহর কাছে একটি দোয়া করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহ! আমার পর এই জালিম যেন আর কোনো মানুষকে হত্যা করার সুযোগ না পায়।"

সাঈদ বিন জুবায়েরের শাহাদাতের পর থেকেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। প্রতি রাতে ঘুমোতে গেলেই তিনি দেখতেন সাঈদ বিন জুবায়ের তার রক্তের ছোপ ছোপ দাগ নিয়ে তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, "হাজ্জাজ, কোন অপরাধে তুমি আমাকে হত্যা করলে?"

তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আর পেটের মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অবশেষে সম্ভাব্য ২ জুন তারিখে মাত্র ৫৩ কি ৫৪ বছর বয়সে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অত্যাচারী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে, রাজকীয় চিকিৎসকেরা যখন তার বাঁচার আশা ছেড়ে দেন, তখন এই দাপুটে শাসক শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "হে আল্লাহ, মানুষ তো বলে আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন না। কিন্তু আমি জানি, আপনার ক্ষমা আমার পাপের চেয়েও বড়। আপনি অন্তত আমাকে সবার সেই ধারণাটুকু ভুল প্রমাণ করার জন্য হলেও ক্ষমা করে দিন!"

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মৃত্যুর খবর যখন বসরার প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বসরীর কাছে পৌঁছাল, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। শূন্যে হাত তুলে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, "আল্লাহ! তুমি যেভাবে এই জালিমকে দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছ, একইভাবে তার রেখে যাওয়া নির্মম স্মৃতি ও নীতিগুলোকেও মানুষের মন থেকে মুছে দিও।"

লোকে তাকে জানালো হাজ্জাজ মৃত্যুশয্যায় শেষ কী আকুল আকুতি করেছিলেন। আজীবন হাজ্জাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার থাকা হাসান বসরী এই অনুশোচনার কথা শুনে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হাজ্জাজ কি আসলেই মৃত্যুর আগে এই কথা বলেছে?"

লোকেরা উত্তর দিল, "হ্যাঁ, ঠিক এই কথাটিই উচ্চারণ করেছে।"

তখন হাসান বসরী এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় ডুবে গেলেন। শান্ত গলায় বললেন, "সে যদি আসলেই খাঁটি মনে এই কথা বলে থাকে, তবে অলৌকিক কিছু ঘটা অসম্ভব নয়। হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেও করতে পারেন!"

অবাক ব্যাপার, নরপিশাচখ্যাত হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার দরবারের দুজন প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ভাষাবিদ নসর ইবনে আসিম এবং ইয়াহিয়া ইবনে ইয়ামারকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন এমন একটি পদ্ধতি প্রচলনের জন্য, যা দিয়ে সাধারণ অনারবরাও নির্ভুলভাবে কুরআনের আরবি চিনে পড়তে পারেন। তারা দুজন তখন নুক্তা (ডট) ও হরকত (জের-জবর-পেশ) ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন। খলিফা হযরত আলী (রা) ও আমিরে মুয়াবিয়া (রা)-র আমলেই অনারবদের মাঝে কুরআন পাঠ করতে সমস্যা হচ্ছিল, কারণ তারা তো আরবদের মতো কেবল অক্ষরের আকার দেখেই উচ্চারণ বলতে পারতো না, তাছাড়া কোথাও কোন স্বরধ্বনি হবে সেটাও বলতে পারতো না। তখন আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি নামের একজন ভাষাবিদ বিভিন্ন স্বরধ্বনি চেনানোর একটি প্রাথমিক ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছিলেন। তার কজন ছাত্র ও সমসাময়িক পণ্ডিতরাও চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু পরবর্তীতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই নুক্তা ও হরকতের কাঠামোতে নিয়ে আসা হয়, এবং এর ব্যবহার ফর্মালাইজ ও পপুলারাইজ করা হয়, যার ফলে অনারবদের কুরআন তিলাওয়াত একদম সহজ হয়ে পড়ে। তখন থেকে মোটামুটি ওই পদ্ধতিতেই অনারবরা কুরআন পাঠ করে চলেছে, যা কিনা অত্যাচারী হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভালো দিক হিসেবে তুলে ধরেন ইতিহাসবিদেরা।

হাজ্জাজকে কেমন চোখে দেখেন, পাঠক?

#টুকরো_ইতিহাস ৬

[উৎস- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কিতাবুল ফিহরিস্ত, আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন, হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া।]
👍14❤13⚡3
গাদির খুম।

রিপ্লাইতে পড়ুন।
❤14
৬৩২ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আওয়াল মাস। নবী (সা)-এর ওফাতের পর মদিনার চিরচেনা আকাশ-বাতাস সাহাবী বিলাল (রা)-র কাছে কেমন যেন অচেনা ও ভারী ঠেকতে লাগল। একটা সময় তিনি ছিলেন এক অত্যাচারিত কৃষ্ণাঙ্গ দাস, আর ইসলামের আবির্ভাবের পর হলেন ইতিহাসের প্রথম মুয়াজ্জিন। যাঁর ইশারায় তিনি প্রতিদিন আযান দিতেন, সেই প্রিয় মানুষটিই আজ নেই। বিলাল (রা) চেষ্টা করেও আর মদিনার মসজিদে দাঁড়িয়ে আযান দিতে পারলেন না। "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ" বলার আগেই তার গলা বুজে আসত, বুক ফেটে কান্না চলে আসত।

ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা) যখন খিলাফতের দায়িত্ব নিলেন, তখন বিলাল (রা) তার কাছে এসে আবদার করে বললেন, “আমি এখন শামদেশে (সিরিয়া) গিয়ে সীমান্ত পাহারা দিতে চাই।"

খলিফা আবু বকর (রা) অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বিলাল (রা)-র হাত ধরে বললেন, "বিলাল! তুমি চলে গেলে আমাদের এই মদিনা যে একদম শূন্য হয়ে যাবে! আমার এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে একা ফেলে যেও না। তুমি মদিনায় থেকে যাও।" খলিফার এই ব্যাকুল অনুরোধ বিলাল (রা) ফেলতে পারলেন না। আবু বকর (রা) যতদিন বেঁচে ছিলেন, তিনি ততদিন মদিনাতেই রয়ে গেলেন, কিন্তু আযান আর দেননি।

খ্রিস্টীয় ৬৩৪ সালে আবু বকর (রা) এর ইন্তেকালের পর যখন খলিফা উমার (রা) দায়িত্ব নিলেন, তখন বিলাল (রা) আবার সিরিয়ায় চলে যাবার অনুমতি চাইলেন। উমার (রা) তাকে আর আটকে রাখতে পারলেন না। বিলাল (রা) মদিনার সব স্মৃতি পেছনে ফেলে দামেস্কে চলে গেলেন। সেখানে এক সাধারণ মুজাহিদের জীবন কাটাতে লাগলেন।

দীর্ঘ কয়েক বছর পর, খলিফা উমার (রা) যখন এক রাষ্ট্রীয় সফরে সিরিয়ার জাবিয়া নামক স্থানে এলেন, তখন ওখানকার মুসলিম সেনাপতি ও সাধারণ মানুষ খলিফাকে ঘিরে ধরলেন। তাদের মাঝে পুরনো দিনের সেই সাহাবীরাও ছিলেন। তারা বললেন, “আমিরুল মুমিনীন! আমাদের মাঝে রাসুলুল্লাহ (সা)-র মুয়াজ্জিন বিলাল উপস্থিত আছেন। আপনি দয়া করে ওনাকে একটিবারের জন্য হলেও আযান দিতে বলুন। আমরা বহু বছর ওনার কণ্ঠে আযান শুনিনি।”

খলিফা উমার (রা) নিজেই বিলালের কাছে গেলেন এবং তাকে আযান দেয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন। প্রিয় খলিফার এই আদেশ বিলাল (রা) অমান্য করতে পারলেন না। দীর্ঘ বছর পর, সিরিয়ার সেই তপ্ত প্রান্তরের বুকে যখন বিলাল আযান দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন এবং সুর তুলে প্রথম শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেন, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার...” তখন পুরো পরিবেশ যেন এক ঝটকায় থমকে গেল।

উপস্থিত সাহাবী ও মুজাহিদেরা ব্যাকুল হয়ে বিলাল (রা)-র চারপাশে এসে জড়ো হতে লাগলেন। তিনি যখন আযানের ওই চরণে এসে পৌঁছালেন, “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ” তখন উপস্থিত সাহাবীদের মনে হলো, আবার বুঝি রাসুলুল্লাহ (সা)-এর যুগে ফিরে গিয়েছেন সবাই।

বিলাল (রা) নিজে আর কান্না ধরে রাখতে পারলেন না, তিনি ওখানেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন। খলিফা উমার (রা) এত জোরে কাঁদতে লাগলেন যে তার চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে বুক ভেসে গেল। উপস্থিত প্রবীণ সাহাবীরা সেদিন শিশুর মতো কাঁদলেন। ইতিহাসে শামের বুকে এমন সম্মিলিত ও স্তব্ধ কান্নার দ্বিতীয় কোনো নজির বুঝি আর নেই।

এই ঐতিহাসিক ঘটনার পর আরও বেশ কিছু বছর কেটে গেল। জীবনের শেষ সময়ে হযরত বিলাল (রা) দামেস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। তার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল। তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলেন। স্বামীর আসন্ন মৃত্যু দেখে বিলালের স্ত্রী হিন্দ কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন, “ওয়া হাজানা!” অর্থাৎ, কী গভীর কষ্ট! কী বিশাল শোক!

কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বিলাল (রা)-র চোখে-মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। তিনি স্ত্রীর এই শোককথার বিপরীতে তৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, “ওয়া তারাবা!” অর্থাৎ, কী পরম আনন্দ! কী মহা উৎসব!

স্ত্রী অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তখন বিলাল (রা) বললেন, "সামনেই তো আমি আমার ভালোবাসার মানুষদের সাথে মিলিত হতে যাচ্ছি, স্বয়ং নবী (সা) এবং তার প্রিয় সাথীদের সাথে!”

৬৪০ সালে দামেস্কের মাটিতেই ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রা) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং ওখানেই তাকে দাফন করা হয়। যার পুরোটা জীবনই কেটেছিল প্রিয় নবীজির বিরহে, মৃত্যুর ওপারে গিয়ে অবশেষে তিনি খুঁজে পেলেন তার সেই চিরকাঙ্ক্ষিত মিলন।

#টুকরো_ইতিহাস ৯

[উৎস- ইবনে আসাকিরের ‘তারিখু দিমাস্ক’, ইবনে কাসিরের ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’, যাহাবির ‘সিয়ার আ‘লামুন নুবালা’, ইবনুল আসিরের ‘উসদুল গাবাহ’, ইত্যাদি। মদিনায় ফেরার একটি ঘটনায় অনুরূপ পাওয়া যায়, তবে সেটা অনেকে দুর্বল বা জাল বলেছেন। অপেক্ষায় থাকুন ইতিহাসের আরও টুকরো ঘটনার জন্য, ইনশাআল্লাহ।]
❤32
আমার আপকামিং বই 'আফটার কারবালা' অর্ডার করে ফেলতে পারেন নিচের যেকোনো লিংক থেকে-

রকমারি-
https://rkmri.co/pmTMeMe3lT0o/

ওয়াফিলাইফ- https://www.wafilife.com/after-karbala/pd/82175

ধী- https://dheebooks.com/book-details/6a1ad8a482f93dcc264ed522/after-karbala

বুকশপার- https://bookshoper.com/book-details/after-karbala
❤5
"ভাইয়া, তিনটা বই কি একসাথে পাওয়া যাবে?" "গিফট বক্স করে দেয়া যাবে, ভাই?" পাঠকেদের এরকম চাওয়া থেকেই আইডিয়াটা মাথায় আসে। বক্সসেট করতে হবে। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার, বক্সের ডিজাইন ধরার বহু আগেই নাকি ৫৩ জন অর্ডার করে বসে আছেন ট্রিলজি! আপনাদের কীভাবে ধন্যবাদ দেব জানি না।

অবশেষে 'প্রফেট ট্রিলজি' বক্সসেটের কভার হাতে পেলাম। ভেতরে আছে দ্য প্রফেট, আফটার দ্য প্রফেট, আফটার কারবালা। তবে অর্ডার করে হাতে যে সেটটা পাবেন, সেটার সাথে এ মকাপের একটা বিশেষ পার্থক্য থাকবে, সেটা নিয়ে বই হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো কথা নেই। আর হ্যাঁ, তিনটি বই আলাদা আলাদা করে কিনলে যে দাম পড়তো, এই বক্সসেট কিনলে তার থেকে কম দাম পড়বে। প্রিঅর্ডার যারা করবেন, তাদের সবগুলা বইয়ে ইনশাআল্লাহ অটোগ্রাফ থাকবে, যেমনটা অনেকে চেয়েছেন।

যারা যারা অর্ডার প্লেস করবেন, সেই অনুযায়ী বক্সসেট বানানো হবে, অর্থাৎ ততসংখ্যক। পরে শেষ হয়ে গেলে আর অর্ডার করা যাবে কিনা জানি না। আর- না, শুধু বক্স আলাদা করে অর্ডার দেয়া যাবে না। এটা ট্রিলজি বক্সসেট অর্ডারকারীদের জন্য প্রযোজ্য। অতিরিক্ত ধন্যবাদ তাদের প্রতি, যারা একাধিক বক্সসেট অর্ডার করেছেন একে ওকে গিফট দেয়ার জন্য। অতুলনীয়, মহান।

যা-ই হোক, অর্ডার করতে পারেন এখুনি- 'প্রফেট ট্রিলজি' (আদী প্রকাশন) 
রকমারি থেকে- https://rkmri.co/I5MSeE20Mele/
ওয়াফিলাইফ থেকে- https://www.wafilife.com/prophet-trilogy/pd/85558
কিংবা, আদী প্রকাশনের পেজ থেকে সরাসরি।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়।
1❤9
৬৫০ এর দশকের শুরুর দিকের কথা। বিখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে একদিন মদিনার উপকণ্ঠের এক নির্জন পথ ধরে যাচ্ছেন। কড়া রোদ। বাতাসে ধুলো উড়ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে তারা ক্লান্ত হয়ে একসময় বসে পড়লেন কিছু খাবার খাওয়ার জন্য। ঠিক তখনই তাদের চোখে পড়ল, এক তরুণ রাখাল এক পাল ভেড়া নিয়ে একাকী হেঁটে যাচ্ছে।

​আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) তাকে মমতা ভরে ডেকে বললেন, “এসো। আমাদের সাথে বসে কিছু খেয়ে নাও।”

​রাখাল বালকটি বিনয়ের সাথে জবাব দিল, “আমি আজকে রোজা।”

​তপ্ত রোদের নিচে, এই নির্জন পথে, এক অতিসাধারণ রাখাল বালকের রোজা রাখার কথা শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বেশ মুগ্ধ হলেন। তিনি বুঝলেন, এই বালকের অন্তরে খোদাভীরুতা আছে। তারপরও তিনি তার সততা আরেকবার যাচাই করতে চাইলেন।

​তিনি বললেন, “তাহলে তোমার এই পাল থেকে একটি পশু আমাদের কাছে বিক্রি করে দাও। আমরা তোমাকে তার দাম দেব, আর তুমি ওই টাকা থেকেই ইফতার করতে পারবে পরে।”

​রাখাল বালক মাথা নেড়ে বলল, “না। এগুলো আমার নয়। আমি একজন গোলাম। এই পশুগুলো আমার মালিকের আমানত। ওনার অনুমতি ছাড়া আমি কিছুই বিক্রি করতে পারি না।”

​আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা) এবার তাকে আরও পরীক্ষা করার জন্য বললেন, “তুমি একটি পশু বিক্রি করে দাও। তোমার মালিক যখন জিজ্ঞেস করবে, তখন বলে দেবে যে নেকড়ে এসে খেয়ে ফেলেছে। তোমার মালিক তো এখানে নেই, উনি তো দেখছেন না।”

​এ কথা শুনে রাখাল বালকটি থমকে দাঁড়াল। তারপর আকাশের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করল, ​“ফা আইনাল্লাহ?” (তাহলে আল্লাহ কোথায়?)

​অর্থাৎ, মালিক না হয় এখানে নেই। মানুষ না হয় দেখছে না। কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমি কী জবাব দেব?

​এই একটি বাক্য শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা)-র হৃদয় কেঁপে উঠল। তিনি বারবার বলতে লাগলেন, “রাখাল বলছে, ‘তাহলে আল্লাহ কোথায়?’ রাখাল বলছে... ”

​মদিনায় ফিরে তিনি সেই রাখালের মালিকের কাছে লোক পাঠালেন। তারপর নিজ অর্থে সেই গোলাম বালকটিকে কিনে মুক্ত করে দিলেন। তিনি নাকি সেই পশুর পালও কিনে তাকে উপহার দিয়েছিলেন।

​বলা হয়, ওই বালককে মুক্ত করার পর তিনি আবেগভরে তাকে বলেছিলেন, “তোমার মুখের এই একটি বাক্য তোমাকে দুনিয়াতে মুক্ত করল। আর আমি আশা করি, এ কথাই পরকালেও তোমার মুক্তির কারণ হবে।”

ফা আইনাল্লাহ?

#টুকরো_ইতিহাস ১০

[উৎস: ইবনে আসাকিরের 'তারিখু দিমাস্ক', যাহাবীর 'সিয়ারু আলামিন নুবালা'।]
❤35
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ের কথা। পারস্যের বিখ্যাত ‘জালুলার যুদ্ধ’ শেষ হয়েছে। সেই যুদ্ধলব্ধ বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ, সোনা-দানা আর মণিমুক্তা উটের পিঠে চেপে মদিনায় এসে পৌঁছেছে। খলিফা উমার (রা)-র আদেশে সেই বিপুল বৈভব সাময়িকভাবে মসজিদে নববীর চত্বরে এনে রাখা হলো। একটি বড় কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো।

সম্পদের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রখ্যাত সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা) পুরো রাত জেগে সেই সম্পদ পাহারা দিলেন।

পরদিন সকালে খলিফা উমার (রা) সাহাবীদের সাথে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। যখন ওপরের আবরণটি সরিয়ে ফেলা হলো, তখন ভেতরের সোনা, রূপা আর জহরত রোদের আলোয় ঝলমল করে উঠল। মদিনার ইতিহাসে এত বিপুল সম্পদের স্তূপ মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি।

উপস্থিত সাধারণ মানুষ এবং সাহাবীরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে লাগলেন। সবাই ইসলামের এই মহান বিজয় দেখে আনন্দিত।

কিন্তু খলিফা উমার (রা)-র প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি সম্পদের এই বিশাল স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে অশ্রু ঝরতে লাগলো। খলিফাকে এভাবে কাঁদতে দেখে আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) বেশ অবাক হলেন।

তিনি কাছে এসে নরম সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “আমিরুল মুমিনীন! আপনি কেন কাঁদছেন? আজ তো আনন্দের দিন। আল্লাহ আজ ইসলামকে মর্যাদা দিয়েছেন এবং শত্রুকে পরাস্ত করেছেন।”

খলিফা উমার (রা) চোখের পানি মুছে তার দিকে তাকালেন। এক বুক হাহাকার আর গভীর দূরদর্শিতা নিয়ে তিনি উত্তর দিলেন, “আবদুর রহমান! তুমি তো কেবল এই সম্পদই দেখছ। কিন্তু জেনে রাখো, আল্লাহ যখনই কোনো জাতিকে এই বিপুল ধন-সম্পদ আর দুনিয়াবি জাঁকজমক দিয়েছেন, তখনই তাদের মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা, হিংসা আর ক্ষোভের দেয়াল তুলে দিয়েছেন!”

খলিফা উমার (রা) মূলত পারস্যের এই সোনা দেখে আনন্দিত হননি; বরং তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে এই বিপুল বৈভব উম্মাহর ভেতরের ঐক্য নষ্ট করে দেবে এবং তাদের দুনিয়ামুখী করে তুলবে। অর্ধেক পৃথিবীর শাসক, যার ভয়ে রোম আর পারস্য কাঁপত, তিনি দুনিয়ার সম্পদ দেখে এভাবে আল্লাহর ভয়ে কেঁদে আকুল হচ্ছিলেন। জাঁকজমকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফিতনাকে চিনে ফেলার এই অবিশ্বাস্য অনুভূতি আজও ইতিহাসের পাতায় এক পরম আচ্ছন্নতার নাম।

#টুকরো_ইতিহাস ১১

[উৎস- আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির]
❤44👍1
সামনেই আশুরা, দশই মুহাররাম। সঙ্গত কারণেই আশুরাকে সামনে রেখে নানা পোস্ট দেখতে পাচ্ছি, সুন্নি-শিয়া নির্বিশেষে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইয়াজিদ তার শাসনামলের ইতিহাসে নিশ্চিত খলনায়ক। কিন্তু যে জিনিসটা আমাকে অবাক করে সেটা হলো, অনেকেই নাকি ইয়াজিদের 'প্রশংসা' করে। কিন্তু কারবালার আফটারম্যাথে যা যা হয়েছে, তাতে ইয়াজিদকে প্রশংসা করার মতো স্কোপটা আছেই বা কোথায়? যে কারণই দর্শানো হোক না কেন, ইয়াজিদ দিনশেষে খলনায়কই। শিয়া সোর্স তো বটেই, এমনকি কিছু সুন্নি সোর্সেও ইয়াজিদকে লানতের কথাই বলা হয়।

তবে আফসোসের ব্যাপার, বেশিরভাগ লোকে কেবল কারবালার ব্যাপারটাই জানে, এর পরের নারকীয়তা নিয়ে ধারণা রাখে না।

আশা করি 'আফটার কারবালা'-র পাঠকদের সে ঘটনাগুলোও জানা হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ। দুই ফিতনার সময়কাল মুসলিম ইতিহাসের অংশ হিসেবে কেন বেশি করে শিক্ষা দেয়া হয় না, কে জানে!

আপনি কি 'আফটার কারবালা'-র অপেক্ষায় আছেন? তাহলে প্রিঅর্ডারের ডিস্কাউন্ট থাকতে থাকতে বইটি বা ট্রিলজির অর্ডার করে ফেলতে পারেন। অনুরোধ একটাই, বইটি শুরুর সময় অবশ্যই প্রথমে দেয়া 'লেখকের কথা' পড়ে নেবেন!
❤19👍2
কারবালার নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক তপ্ত রক্তাক্ত প্রান্তর, ফোরাতের তীর, অবরুদ্ধ এক কাফেলা, আর ইতিহাসের বুক চিরে ওঠা হাহাকার। কিন্তু কারবালা কি শুধুই এক দিনের ট্র্যাজেডি? কেবলই আশুরার বিকেলে শেষ হয়ে যাওয়া এক শোকগাথা? নাকি এর পেছনে ছিল বহু বছরের জমে ওঠা রাজনৈতিক দ্বৈরথ?

এ বইতে চেষ্টা করা হয়েছে কারবালাকে শুধু একটি মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং তার রক্তাক্ত পটভূমি, ভয়াবহ পরিণতি এবং প্রতিশোধের ঢেউসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখাতে।

মদিনায় কি গণহত্যা করা হয়েছিল? মক্কায় অবরোধ চালানো হয়েছিল কেন? খুলাফায়ে রাশেদিনের পর উমাইয়া শাসনের টালমাটাল সময়ে কী কী হলো? উটের যুদ্ধ কেন হয়েছিল? সিফফিনের যুদ্ধের ফলাফল কী ছিল? সুন্নি শিয়া বিভেদের গভীর শিকড় কীভাবে গজালো? সব মিলিয়ে কারবালার কাহিনি আসলে একদিনের নয়। ‘আফটার কারবালা’ বইতে উঠে এসেছে সেই পুরো ছবিটুকু। শুধু কারবালার ময়দান নয়, আছে এর আগের উত্তাল রাজনীতিও। শুধু শাহাদাত নয়, তার পরের প্রতিক্রিয়াও। শুধু শোক নয়, প্রতিশোধও। শুধু পরিচিত বয়ান নয়, জানুন কম শোনা অধ্যায়ও।

এ ইতিহাস কেবল চোখই ভেজায় না, প্রশ্নও জাগায়। কীভাবে মুসলিম উম্মাহ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছিল? কেন এমন হলো? কারা এই বিপর্যয়ের পথ তৈরি করলো? কুফা কেন বিশ্বাসঘাতকতা করল? ইয়াজিদের বিরুদ্ধে আপত্তি ছিল কী কী? কারবালার পরে যারা বেঁচে রইলো, তারা কী করলো? প্রতিশোধ কি সত্যিই নেয়া হয়েছিল? কারা নিল? কতদূর নিলো? আর এই এক ঘটনার পর মুসলিম ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিল?

এসবের উত্তর খুঁজতেই এই বই। পাবেন সেইসব প্রশ্ন, যেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা যায়, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যদি জানতে চান কারবালা কীভাবে ঘটলো, কেন ঘটলো, আর তার অভিঘাত কতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেলো, তাহলে এই বই আপনাকে থামতে দেবে না। একের পর এক ঘটনা আর ইতিহাসের অন্ধকার মোড় আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতপরবর্তী সেই যুগে। সুতরাং, পড়তে শুরু করুন মর্মান্তিক কারবালার রক্তাক্ত পটভূমি, পরিণতি ও প্রতিশোধের জানা-অজানা রুদ্ধশ্বাস এক ইতিহাস- ‘আফটার কারবালা’; প্রবেশ করুন ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাময়, সর্বাধিক আলোচিত এক অধ্যায়ে।

বই-
'আফটার কারবালা'
মর্মান্তিক কারবালার রক্তাক্ত পটভূমি, পরিণতি ও প্রতিশোধের
জানা-অজানা রুদ্ধশ্বাস ইতিহাস
পৃষ্ঠা ৫৬০+
মুদ্রিত মূল্য- ১০৫০ টাকা
লেখক- আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ
❤13
তেহরানে আয়াতোল্লাহ খামেনীর জানাজার জন্য আমন্ত্রিতদের তালিকায় ছিল না সৌদির নাম, এমনটাই এসেছে ইরানি মিডিয়ায়। ব্যাপারটা বোধগম্য, যেহেতু তাদের দা-কুমড়া সম্পর্ক। কিন্তু অনেকটা সারপ্রাইজ ভিজিট হিসেবেই সম্মান জানাতে সৌদি দল হাজির হয়েছে। নেতৃত্বে আছেন সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খুরাইজি।

তো, তারা যখন এগিয়ে গেলেন, তখন ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনের যে আয়াতের তিলাওয়াত ছাড়া হলো, সেটি সূরা আলে ইমরানের ১৩ নং আয়াত, "নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে দুটি দলের মধ্যে, যারা পরস্পর মুখোমুখি হয়েছিল। একটি দল লড়াই করছিল আল্লাহর পথে আর অপর দলটি কাফির। তারা বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদেরকে ওদের দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ নিজ সাহায্য দ্বারা যাকে চান শক্তিশালী করেন। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে চক্ষুষ্মানদের জন্য শিক্ষা।" [সূরা আলে ইমরান ৩:১৩]

ভাবছেন, অন্য কোন দেশের ক্ষেত্রে কী আয়াত শুনিয়েছে ইরান? চলুন জেনে নিই।

তুরস্কের ক্ষেত্রে-

“যেসব মুমিন কোনো ওজর ছাড়া ঘরে বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে, তারা সমান নয়। আল্লাহ মুজাহিদদের মর্যাদা বসে থাকা লোকদের ওপর উচ্চ করেছেন এবং প্রত্যেকের জন্য কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; তবে মুজাহিদদের জন্য তিনি অধিক মহাপুরস্কার নির্ধারণ করেছেন।” [সূরা নিসা ৪:৯৫]

কাতারের ক্ষেত্রে-

“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ত্রুটি ক্ষমা করেন, আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন এবং আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আল্লাহ আপনাকে পরাক্রমশালী সাহায্য দান করেন।” [সূরা আল-ফাতহ ৪৮:১–৩]

ফি/লিস্তিনের ক্ষেত্রে-

“পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্বসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা বনি ইসরাঈল ১৭:১]

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে-

“বলুন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সত্যের সঙ্গে প্রবেশ করান, সত্যের সঙ্গে বের করুন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাকে সাহায্যকারী শক্তি দান করুন।” [সূরা বনি ইসরাঈল ১৭:৮০]

ভারতের ক্ষেত্রে-

“যাদেরকে লোকে খবর দিয়েছিল যে, একটা বড় বাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হচ্ছে, কাজেই তাদেরকে ভয় কর। তখন ওই কথা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিল এবং তারা বলল, ‘আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!’ ” [সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৩]

সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত থেকে কাউকে পাঠানো হয়নি।

ও হ্যাঁ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে আয়াত তিলাওয়াত করা হয়-

“যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনই মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট জীবিত; তাদের রিযিক দেয়া হয়। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তা লাভ করে তারা আনন্দিত আর যে সব ঈমানদার লোক তাদের পেছনে (পৃথিবীতে) রয়ে গেছে, এখনও তাদের সাথে এসে মিলিত হয়নি, তাদের কোন ভয় ও চিন্তে নেই জেনে তারা আনন্দিত।” [সুরা আলে ইমরান ৩:১৬৯-১৭০]

যা-ই হোক, ৮ জুলাই আয়াতোল্লাহ খামেনীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কারবালায়।
.
.
.
.
পুনশ্চঃ আমার আসন্ন ‘আফটার কারবালা’ বইটি সংগ্রহ করেছেন কি? আশা করছি, হতাশ হবেন না আমার পাঠকেরা।
❤37
বইয়ের লেখকের নাম, আর বাংলা সংস্করণের প্রস্তাবিত প্রচ্ছদ- এ দুটো দেখেই আমি রাজি হয়ে যাই। আগামী বইগুলোর পরিকল্পনায় এ বইটি একদমই ছিল না, বিশ্বাস করুন। অবাক হলাম শুনে, এ বইয়ের খোঁজে মানুষ আদী প্রকাশনের পেজে হানা দিচ্ছে। পাঠকেরা আফটার কারবালার জন্য অপেক্ষা করেছেন, প্যারিসের জন্য করতে আর বাধা কী! দেখুন তো দেখি, বাংলাটা কেমন হচ্ছে, পাঠক?
❤19👏1
ক্যালেন্ডারে নামটা দেখেছেন হয়তো। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। ছোটবেলায় স্কুলে তো নিঃসন্দেহে এ দিনটায় ছুটি কাটিয়েছেন। নামটা যেমন একটু অন্য রকম, ছুটিটাও তেমন। বাংলাদেশে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ উপলক্ষ্যে স্কুল বন্ধ থাকতে পারে, অথচ পাশের সরকারি অফিস খোলা। ব্যাংক খোলা। করপোরেট অফিসেও চলে স্বাভাবিক কাজকর্ম।

তাহলে ব্যাপারটা কী?

আগে নামের রহস্যটা ভাঙা যাক। ‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ। অর্থ ‘এগারোতম’, বা একাদশ। আরবি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে স্মরণ করা হয় প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত আবদুল কাদির জিলানী (র)-কে। প্রচলিত মতে, হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানি তিনি ইন্তেকাল করেন। সেই ‘এগারো’ থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তার স্মরণে পালিত হতে থাকে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। অনেক জায়গায় এটি ‘গিয়ারভি শরিফ’ নামেও পরিচিত। উর্দু-হিন্দিতে ‘গিয়ারহ’ মানে এগারো। সেখান থেকে ‘গিয়ারভি’ বা ‘গিয়ারহভি’ মানে এগারোতম। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ক্ষেত্রে 'ফাতেহা' বলতে বোঝায় কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষ করে সূরা ফাতিহা পাঠ, দোয়া এবং সওয়াব পৌঁছাবার উদ্দেশ্যে স্মরণানুষ্ঠান।

বাংলায় এই আয়োজন অবশ্য নতুন নয়। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের মিয়া সাহেবের ময়দান খানকাহ শরিফে তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালনের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ জন্মের বহু আগেই এ অঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিল দিনটি। বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান ছুটির কাঠামোয় ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম মুসলিমদের ঐচ্ছিক ছুটির তালিকায় রয়েছে। স্কুল-কলেজ-মাদরাসার ক্ষেত্রে গল্পটা আলাদা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষাপঞ্জিতে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষ্যে ছুটি রাখা হয়। ফলে সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় সাধারণত ওই দিন শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ থাকে। যেমন ২০২৬ সালে সেটা ২৩ সেপ্টেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আবার এক নিয়ম নয়। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছুটি নির্ধারণ করতে পারে। ফলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকতে পারে, অন্যটি খোলাও থাকতে পারে।

আব্দুল কাদের জিলানী (র) ছিলেন খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকের (১০৭৭-১১৬৬) বাগদাদের একজন বিশিষ্ট আলেম, ধর্মপ্রচারক ও সুফি সাধক। ইসলামি শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে তার বক্তব্য ও শিক্ষা পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে গভীর প্রভাব রেখেছে। তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘কাদেরিয়া সুফি তরিকা’, যা পরে মুসলিম বিশ্বের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
❤34👍11
আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে একটা পুরোনো ঘণ্টা আছে। নাম হচ্ছে লিবার্টি বেল। প্রায় এক টন ওজনের ব্রোঞ্জের ঘণ্টা। গায়ের রং তামাটে, বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে এর গায়ে লম্বা একটা ফাটল। ওপর থেকে নেমে এসেছে প্রায় নিচ পর্যন্ত। ফাটলটার কারণে ওটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ঘণ্টাগুলোর একটি। তবে এর পেছনে কয়েকটা ঘটনা আছে।

সময়টা ১৭৫২ সাল। তখন আমেরিকা বলে স্বাধীন কোনো রাষ্ট্র নেই। ব্রিটিশ কলোনির অন্তর্ভুক্ত পেনসিলভানিয়ার তৎকালীন রাজধানী ফিলাডেলফিয়ার প্রশাসনিক ভবনের জন্য লন্ডন থেকে আনা হলো নতুন একটা ঘণ্টা। উদ্দেশ্য অতি সাধারণ। সরকারি সভার সময় মানুষকে ডাকা, গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেয়া, কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষ্যের খবর জানানো।

কিন্তু বিপত্তি ঘটল ঘণ্টাটা পরীক্ষা করতে গিয়েই। প্রথমবার বাজানোর সময়ই ফেটে গেল নতুন ঘণ্টা! এত দূর থেকে আনা ঘণ্টা, আর সেটাই কিনা প্রথম আঘাতে নষ্ট! ফিলাডেলফিয়ার দুই স্থানীয় কারিগর দায়িত্ব নিলেন ঘণ্টাটি ঠিক করার। তারা ভাঙা ঘণ্টার ধাতু গলিয়ে নতুন করে ঢালাই করলেন। প্রথমবার নতুন ঘণ্টার আওয়াজ সন্তোষজনক হলো না। ফলে ১৭৫৩ সালে আবার ঢালাই করতে হলো। এবার কাজ হলো। নতুন ঘণ্টা বেজে উঠলো ফিলাডেলফিয়ার আকাশে।

এরপর কেটে গেল অনেকগুলো বছর। ঘণ্টা বাজল সরকারি সভায়, শহরের নানা প্রয়োজনে। এর মধ্যেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে অসন্তোষ বাড়তে শুরু করেছে। একসময় সেই অসন্তোষ রূপ নিল স্বাধীনতার আন্দোলনে। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হলো। আর ৮ জুলাই ফিলাডেলফিয়ায় সাধারণ মানুষের সামনে প্রথমবার সেটা পাঠ করা হলো।

বলা হয়, সেদিন মানুষকে জড়ো করতে বেজে উঠেছিল এই লিবার্টি বেল।

আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের বহু আগে থেকেই ঘণ্টাটার গায়ে খোদাই করা ছিল তাওরাতের বাণী, "তোমরা পুরো দেশের সমস্ত বাসিন্দাদের জন্য স্বাধীনতা (/মুক্তি) ঘোষণা করো।" (লেবীয় পুস্তক ২৫:১০) (Proclaim Liberty Throughout All the Land Unto All the Inhabitants Thereof.)

স্বাধীনতা ঘোষিত হলেও তখনও আমেরিকার সবাই স্বাধীন নয়! কারণ, দাসপ্রথা তখনো চালু। উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনকারীরা ঘণ্টাটার গায়ের এই লেখাকে নতুন অর্থ দিলেন। তারাই পুরোনো স্টেট হাউজ বেলকে পরিচিত করে তুললেন 'লিবার্টি বেল' নামে।

কিন্তু তত দিনে ঘণ্টাটার শরীরও দুর্বল হতে শুরু করেছে।

প্রায় নব্বই বছর ধরে বাজতে বাজতে উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে এর গায়ে সরু একটা চিড় দেখা দিল। চিড়টা এতই সরু ছিল যে প্রথমে খুব একটা বোঝা যেত না। কিন্তু সমস্যা হলো, ঘণ্টা বাজালে কম্পনের কারণে সেটা আরও বড় হয়ে যেতে পারে।

১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আবার ঘণ্টা বাজানোর আয়োজন করা হলো। তার আগে কারিগরেরা ভাবলেন, ফাটলটা মেরামত করা দরকার।

তারা একটা বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করলেন। কিন্তু তাদের মাতব্বরি একদমই কাজে লাগলো না। ১৮৪৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিনের সরকারি উদ্‌যাপনে ঘণ্টাটা আবার বাজানো হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা দিল নতুন বিপদ। পুরোনো ফাটলের ওপরের অংশ থেকে আরেকটা চিড় ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি উঠে গেছে ঘণ্টার গায়ে খোদাই করা 'LIBERTY' শব্দটির মধ্য দিয়ে।

এবার আর মেরামতের সুযোগ রইল না। চিরদিনের মতো থেমে গেল লিবার্টি বেলের আওয়াজ।

এরপর প্রায় দুই শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। ঘণ্টাটি এখন ফিলাডেলফিয়ার লিবার্টি বেল সেন্টারে সংরক্ষিত। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে সেটাকে দেখতে। কিন্তু ঘণ্টা তো আর বাজে না। ভাঙা ঘণ্টাটা দেখতে আমিও গিয়েছিলাম আজ। অবশ্য এ জিনিসে হাত দেয়া যাবে না জানতাম না। স্পর্শ করতেই আশপাশের আমেরিকানরা আর্তচিৎকার করে উঠল, যেন মহাপবিত্র কিছুতে হাত দিয়ে ফেললাম।

কাকতালীয় ব্যাপার, যুক্তরাষ্ট্রে আজ ১২ অক্টোবর ছিল কলম্বাস ডে। অর্থাৎ এদিনই ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে আমেরিকায় পা রাখেন। সেই সাথে আমেরিকার মূল স্থানীয়দের স্বাধীনতার অবসানের সূচনা হয়।

মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ!
1👍12❤10