সালাফি ARTICLE
1.51K subscribers
636 photos
20 videos
226 links
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

দ্বীনের সঠিক জ্ঞানের সমুদ্রে ডুব দিন,
আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন করুন।
Download Telegram
📄 জামা‘আতুত তাবলীগ সম্পর্কে দেওবন্দি হানাফি আলেমদের বক্তব্য।
🖋️ আবু খুযাইমাহ আনসারী

জামা‘আতুত তাবলীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামা‘আহর আলেমগণ তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তাদের কর্মপদ্ধতি এবং মানহাজের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বিভিন্ন ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত ও স্পষ্ট করে আসছেন। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-হাদীসের আলেমগণ যখন কিতাব ও সহীহ সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতে জামা‘আতুত তাবলীগের ভুলগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, তারপরও তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি এবং হচ্ছে না।

এই পুরো মতবিরোধের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—আহলুস সুন্নাহ ও আহলুল হাদীস যে বিষয়গুলোতে জামা‘আতুত তাবলীগের সমালোচনা করেছেন, তাদের নিজেদের নেতৃস্থানীয় দেওবন্দি হানাফি আলেমরাও ঠিক একই বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন। যেমন:

- জামা‘আতুত তাবলীগের পদ্ধতি কুরআন, সুন্নাহ কিংবা সালাফে সালেহীনের বুঝের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
- সাধারণ মানুষের আকীদা সংশোধনের বিষয়টি তারা পরিত্যাগ করেছে।
- তাওহীদের (আল্লাহর একত্বের) মৌলিক আকীদাকে ছেড়ে দিয়ে নামাজের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং তাবলীগের কাজকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে অভিহিত করা।
- জ্ঞান ছাড়া কথা বলা; এমন সাধারণ মানুষকে বক্তৃতা ও ওয়াজ করার সুযোগ দেওয়া, যাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।
- জামা‘আতুত তাবলীগের পদ্ধতিই সংশোধনের একমাত্র পদ্ধতি এবং এটিই পূর্ণাঙ্গ—এমন বিশ্বাস রাখা।

📄 দেওবন্দি হানাফি আলেমদের বক্তব্য:

মাওলানা এহতিশামুল হাসান খান্দেলভী ছিলেন জামা‘আতুত তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াসের শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাওলানা এহতিশামুল হাসান ‘জিন্দেগী কি সিরাতে মুস্তাকীম’ (জীবনের সরল পথ) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থের শেষে তিনি ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট’ নামে একটি ছোট পুস্তিকা সংযুক্ত করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন:

“আমার জ্ঞান ও উপলব্ধি অনুযায়ী, বর্তমান নিজামুদ্দীনের (দিল্লি—তাবলীগী জামা‘আতের সদর দপ্তর) তাবলীগের পদ্ধতি কুরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি এটি হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী, হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী কিংবা সত্যপন্থী আলেমদের পদ্ধতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, যে আলেমগণ এই তাবলীগে অংশগ্রহণ করেন, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত—এই প্রচেষ্টাকে কুরআন, হাদীস, সালাফ (পূর্ববর্তী নেককার আলেমগণ) এবং সত্যপন্থী আলেমদের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।”

এর জবাবে আরেকজন দেওবন্দি হানাফি আলেম মাহমুদ হাসান গাঙ্গোহী (তিনি মাওলানা মাহমুদুল হাসান বা শাইখুল হিন্দ নন) বলেন:

“আজ পর্যন্ত আমি মনে করতাম যে, তিনি (মাওলানা এহতিশামুল হাসান) অসুস্থতার কারণে খান্দেলায় অবস্থান করছেন এবং এ কারণেই নিজামুদ্দীনে উপস্থিত হওয়া ও তাবলীগের কাজে অংশগ্রহণ ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই ‘গুরুত্বপূর্ণ নোট’ থেকে জানতে পারলাম যে, তার অংশগ্রহণ না করার কারণ হলো—তার মতে তাবলীগের এই কাজ প্রয়োজনীয় নয়; বরং এটি দ্বীনকে ধ্বংস করছে।”

(চশমাহ আফতাব, পৃষ্ঠা ৭)

‘চশমাহ আফতাব’-এর লেখক ক্বমরুদ্দীন মাযাহিরী তার ভূমিকায় লিখেছেন:

“মাওলানা এহতিশামুল হাসান এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অতি সম্প্রতি তিনি জামা‘আতুত তাবলীগকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে, এটি এমন একটি দল, যারা মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করে।”

(চশমাহ আফতাব, পৃষ্ঠা ৩)

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়্যাহ বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং একই সঙ্গে তাবলীগীদের ও দেওবন্দীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:

“তবে আমিও শুনছি যে, মাওলানা থানভীর কিছু খলিফা ও বিশেষ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ জামা‘আতুত তাবলীগকে পছন্দ করেন না।”

(চশমাহ আফতাব, পৃষ্ঠা ১১)

খলীল আহমাদ সাহারানপুরীর প্রতিনিধি (খলিফা) এবং জামা‘আতুত তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইলিয়াস ও তার ছেলে মাওলানা ইউসুফের ঘনিষ্ঠ কর্মী দেওবন্দি আলেম আবদুর রহীম শাহ বলেন:

“যে কাজটি জ্ঞানীদের জন্য নির্ধারিত, সাধারণ মানুষ সেটিই করতে চায়। অথচ তারা শুধু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞই নয়; বরং তাদের অজ্ঞতা ও অসৎকর্মের কারণে সমাজে তাদের ভালোভাবেও দেখা হয় না। এরপর এই কথাটি বিবেচনা করুন: ‘যখন কোনো জাতির নেতা খারাপ হয়ে যায়, তখন সে তার জাতিকে কেবল ধ্বংসের পথই শিক্ষা দেয়।’”

(উসূলু দা‘ওয়াতি ওয়াত-তাবলীগ, পৃষ্ঠা ৩)

তিনি আরও বলেন:

“আমি (আবদুর রহীম) আল্লাহর কসম করে বলছি যে, আমি যে তাবলীগ করছি, তা কেবল প্রয়োজনের কারণে করছি। ফলে মানুষের কাছে আমি ওজরগ্রস্ত। কারণ, এই যুবকেরা যখন থেকে প্রকাশ্যে ওয়াজ শুরু করেছে—যার জন্য শরীয়ত অনুযায়ী তাদের কোনো অনুমতি নেই—এবং তাবলীগের ফযীলত ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেছে, তখন তারা দ্বীনের অন্যান্য দিকগুলো প্রকাশ্যে গোপন করেছে। ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও যখন তাদের থামানো হয়নি, তখন এসব পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উচিত বিষয়টি প্রকাশ্যে ও সর্বসমক্ষে
❤3
তুলে ধরা।”

(উসূলু দা‘ওয়াতি ওয়াত-তাবলীগ, পৃষ্ঠা ৫২)

মাওলানা আবদুর রহীম শাহ লিখেছেন:

“বিদ‘আতকে (সুন্নাহ-বহির্ভূত বিষয়কে) সুন্নাহ মনে করা আকীদাগত দিক থেকে একটি নিন্দনীয় কাজ। মানুষের কিছু আমল সংশোধন করা অথচ তাদের আকীদার ত্রুটিগুলোর প্রতি চোখ বন্ধ করে রাখা কীভাবে সঠিক হতে পারে—তা আমি বুঝতে পারি না। কারণ সঠিক আকীদাই মুক্তির মাধ্যম; আমল নয়।”

(উসূলু দা‘ওয়াতি ওয়াত-তাবলীগ, পৃষ্ঠা ৬৪)

প্রসিদ্ধ দেওবন্দি আলেম মানযূর আহমাদ নু‘মানী জামা‘আতুত তাবলীগের বিরুদ্ধে একটি আপত্তি উত্থাপন করে বলেন:

“এই ভুলটি বেশ ব্যাপক যে, সাধারণ সমাবেশগুলোতে এমন লোকদের বক্তৃতা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যারা এর উপযুক্ত নয়। কখনো কখনো এই লোকেরা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কেও পূর্ণ জ্ঞান রাখে না। ফলে কথা বলার সময় তারা তাদের জ্ঞানের সীমাও উপলব্ধি করে না। এ ব্যাপারে এটাই বাস্তবতা এবং এই ভুলগুলো প্রায়ই ঘটে থাকে। অতএব, ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের এ বিষয়ে চিন্তা ও পর্যালোচনা করা উচিত।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৪৪)

আবুল হাসান আলী নদভী বলেন:

“মাওলানার (আশরাফ আলী থানভী) একটি অসন্তোষের বিষয় ছিল—জ্ঞান ছাড়া এসব মানুষ (অর্থাৎ জামা‘আতুত তাবলীগ) কীভাবে মানুষকে তাবলীগের গুরুত্বের দিকে আহ্বান করবে? অতঃপর যখন (মাওলানার ভাগ্নে) যাফর আহমাদ থানভী তাকে জানালেন যে, যেসব বক্তা এসব বক্তব্য দেন, তারা কেবল তাদেরকে যে বিষয়গুলোতে কথা বলতে বলা হয়েছে সেসব বিষয়েই কথা বলেন এবং এর বাইরে কিছু বলেন না, তখন তিনি (মাওলানা আশরাফ আলী) সন্তুষ্ট হলেন।”

(দীনী দা‘ওয়াত, পৃষ্ঠা ১২৬)

মাওলানা যাফর আহমাদ থানভীর জীবনীকার মাওলানা আবদুশ শাকুর তিরমিযী বলেন:

“আমরা আরও ব্যাপকভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, যারা তাবলীগের উদ্দেশ্যে সফর করেন, তাদের জ্ঞান নেই। এর ফলে বক্তারা বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলেন এবং এর সঙ্গে গল্প ও লোককাহিনি উল্লেখ করেন। আর এভাবে তাদের অধিকাংশই তাদের জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করেন।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৪২)

মাওলানা যাফর আহমাদ থানভী নিজেই বলেন:

“মানুষকে ইসলামের জ্ঞান এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞানের ওপর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জামা‘আতুত তাবলীগের বর্তমান পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৫২)

তিনি আরও বলেন:

“ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তির তাবলীগ নির্ভরযোগ্য নয়।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৫৩)

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, মাওলানা যাফর আহমাদ থানভী এমন একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেছেন, যিনি জামা‘আতুত তাবলীগের পদ্ধতি অনুসারে তাবলীগ করেন এবং তাকে ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আবদুশ শাকুর তিরমিযী লিখেছেন:

“মাওলানা (যাফর আহমাদ) কখনোই জামা‘আতুত তাবলীগে যোগদান করা এবং তাদের সঙ্গে কাজ করাকে যথেষ্ট মনে করতেন না।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৪১)

দারুল উলূম দেওবন্দের আরেকজন শিক্ষক বলেন:

“আমি যখন তাদের (অর্থাৎ জামা‘আতুত তাবলীগের) তাবলীগের পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তখন থেকেই আমি কখনোই এতে সন্তুষ্ট ছিলাম না।”

(তানবীহাত, পৃষ্ঠা ১২)
❤1
📄 সাহাবায়ে কেরামের মাওকূফ বর্ণনাসমূহের ব্যাপারে হানাফীদের অবস্থান।
🖋️ আবু হিব্বান ও আবু খুযাইমাহ আনসারী।

আ‘ঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র জগতের রব। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর সম্মানিত শেষ নবী, তাঁর সম্মানিত পরিবার, তাঁর মর্যাদাবান সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত উত্তমভাবে তাঁদের অনুসরণকারীদের ওপর....

সমস্ত অস্তিত্বের রবের জন্যই সকল প্রশংসা এবং তাঁরই উদ্দেশ্যে সকল প্রশংসা নিবেদিত।

তাঁর প্রিয় ও শেষ রাসূলের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক, তাঁর সম্মানিত পরিবার ও মর্যাদাবান সাহাবীগণের ওপর এবং তাঁদের ওপরও, যারা উত্তমভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে শেষ সময় পর্যন্ত।

◑ ভূমিকা

এটি একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ। এতে হানাফীদের—বিশেষত দেওবন্দী ও বেরেলভীদের—মূলনীতি এবং নবী ﷺ-এর ঐশী হাদীসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। এই প্রবন্ধে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আলোচনা ও পর্যালোচনা করার উদ্দেশ্য রয়েছে:

- সাহাবায়ে কেরামের মাওকূফ বর্ণনার ব্যাপারে হানাফীদের অবস্থান।
- সাহাবায়ে কেরামের প্রতি হানাফীদের আক্রমণ।
- বুখারী ও মুসলিমের রাবীদের প্রতি হানাফীদের তীব্র আক্রমণ। কেন এবং কী উদ্দেশ্যে?
- হানাফী ও নবী ﷺ।
- বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাগুলোর সমালোচনা কে করেছেন—ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী رحمه الله, নাকি হানাফীরা? এবং কেন?

কোনোভাবেই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য আকীদাহ বা ফিকহের এমন বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা নয়, যেখানে হানাফীরা—অর্থাৎ দেওবন্দী ও বেরেলভীরা—তাদের দলাদলি ও মাযহাবের অন্ধ অনুসরণের কারণে হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছে।

এ প্রবন্ধে হানাফী-দেওবন্দীদের তথাকথিত ‘ফিকহ’-এর অসংগতিগুলোও আলোচনা করা হবে না। কারণ তাদের ‘ফিকহ’ মূলত বিচ্ছিন্ন মতামত ও ফতোয়ার এমন এক বিশৃঙ্খল সমষ্টি, যা শুধু ঐশী দলীলের বিরোধিতা করে না; বরং সালাফে সালেহীন ও তাঁদের ফতোয়ারও বিরোধিতা করে। যারা সময় ও ধৈর্য নিয়ে হানাফী গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে দলীলগুলো একত্র করতে পারবেন, তারা বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

অতঃপর— শত শত বছর ধরে পথভ্রষ্ট লোকেরা আহলুল হাদীসের প্রতি বিভিন্ন অপবাদ ও গালিগালাজ করে আসছে। হানাফীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষত দেওবন্দী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয় যে, আহলুল হাদীস এমন একটি দল, যারা সাহাবায়ে কেরামের رضي الله عنهم أجمعين বক্তব্য ও হাদীস গ্রহণ করে না এবং এর মাধ্যমে তারা শিয়াদের ও পথভ্রষ্টদের সাদৃশ্য গ্রহণ করেছে।

যদি হানাফীরা এ কথা বোঝাত যে, কোনো সাহাবীর বক্তব্য যদি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত মারফূ‘ হাদীসের বিরোধী হয়, তাহলে সেই সাহাবীর বক্তব্যকে মারফূ‘ হাদীসের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না—তাহলে তাদের এ বক্তব্য সঠিক হতো এবং আহলুল হাদীসের অবস্থানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। কারণ আহলুল হাদীস রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র হাদীসের বিরোধিতা করে কোনো ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ বা তার মতামত আঁকড়ে ধরা অনুমোদন করেন না।

কিন্তু হানাফীরা তাদের চিরাচরিত দ্বিমুখী পদ্ধতিতে ইঙ্গিত করেছে যে, আহলুল হাদীসের এই অবস্থান শুধু ভুলই নয়; বরং এটি সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের হাদীসের ওপর আক্রমণ।

মজার বিষয় হলো, হাদীস প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে দেওবন্দীরাই অগ্রগণ্য। প্রকৃতপক্ষে হানাফী মাযহাবের কাছে সুন্নাহ ও হাদীসকে কিয়াস ও ব্যক্তিগত মতামতের সমপর্যায়ের একটি গৌণ উৎস হিসেবে দেখা হয়। বরং বহু ক্ষেত্রে পরবর্তী মতামতকে বরকতময় হাদীসের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—ইনশাআল্লাহ পরবর্তী অংশে এর উদাহরণ তুলে ধরা হবে।

হাদীসের ক্ষেত্রে প্রচুর প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হানাফী-দেওবন্দীরা শুধু মাওকূফ রেওয়ায়াত—অর্থাৎ যেসব বর্ণনা সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে কিন্তু নবী ﷺ পর্যন্ত পৌঁছেনি—প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং তারা আরও অগ্রসর হয়ে কিছু সাহাবীর সমালোচনা করেছে এবং সাহাবীদের ‘আদালাহ’ (عدالة) ও ‘দব্‌ত’ (ضبط)—অর্থাৎ তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা, নির্ভরযোগ্যতা, জ্ঞান সংরক্ষণ ও নির্ভুলতার ওপরও আক্রমণ করেছে। এর কারণ হলো, এসব সাহাবীর বর্ণনা হানাফী মাযহাব অথবা হানাফী কিয়াসের বিরোধী ছিল।

সুতরাং প্রকৃতপক্ষে শিয়াদের সঙ্গে সাদৃশ্য তারাই গ্রহণ করেছে—আহলুল হাদীস নয়। এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হলো তা প্রমাণ করা।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, এই প্রবন্ধে হানাফী ও সাহাবীদের বিষয় দিয়ে শুরু করা হলো কেন?

এর উত্তর হলো—দেওবন্দীরাই এমন সম্প্রদায়, যারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়ে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয় যে তারা সাহাবায়ে কেরামের রক্ষক এবং তাঁদের প্রতি তাদের সর্বাধিক ভালোবাসা রয়েছে। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

যাই হোক, সাহাবায়ে কেরামকে দিয়ে শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের আকীদাহর একটি মূলনীতি হলো—আমাদের দ্বীনের সম্পূর্ণ বুঝ সাহাবায়ে কেরামের বুঝের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা সরাসরি নবী ﷺ-এর কাছ থেকে দ্বীন শিখেছিলেন এবং এ কারণে তাঁরা নবী ﷺ-এর উম্মতের কাছে সত্য ও ওহী পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিলেন।
সহজ ভাষায় বললে, কেউ যদি সাহাবায়ে কেরামের ওপর আক্রমণ করে—যেমনটি দেওবন্দীরা করে—তাহলে সেই আক্রমণ ইসলামের ভিত্তি ও ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার ওপরই আক্রমণ।

সাহাবায়ে কেরামের মাওকূফ বর্ণনার ব্যাপারে হানাফীদের অবস্থান

‘ধোঁকা দেওয়ার’ প্রক্রিয়ার সূচনা

হানাফীরা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে, আমরা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অসম্মান করি। কারণ, কোনো সাহাবীর মাওকূফ রেওয়ায়াত যদি মারফূ‘ রেওয়ায়াতের বিরোধী হয়, তাহলে আমরা সেই মাওকূফ রেওয়ায়াতকে মারফূ‘ রেওয়ায়াতের ওপর অগ্রাধিকার দিই না।

এখানে লক্ষণীয় যে, দেওবন্দরাও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একই ধরনের মত পোষণ করে।

নিচে দেওবন্দীদের এমন কিছু বক্তব্যের উদাহরণ দেওয়া হলো, যা তারা মানুষের সামনে পেশ করে। এসব বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে, তারা বলতে চাচ্ছে—নবী ﷺ-এর হাদীস ও আমলের বিরোধী হলে কোনো সাহাবী পর্যন্ত অনুসরণযোগ্য নন।

অবশ্য তাদের এ বক্তব্য বাস্তবে অর্থহীন। কারণ প্রকৃত বাস্তবতা হলো—এটি তাদের ইমাম আবু হানীফা رحمه الله (মৃ. ১৫০ হিজরী)-এর অবস্থান রক্ষা করার জন্য সাহাবীদের গ্রহণযোগ্যতাকে আক্রমণ করা, তাঁদের প্রত্যাখ্যান করা, তাঁদের গালি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সবকিছু করার একটি কুটিল পরিকল্পনা। সাহাবায়ে কেরাম কিংবা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বর্ণনা যা-ই হোক না কেন, আবু হানীফার মত রক্ষাই তাদের উদ্দেশ্য।

এটাই দেওবন্দী সম্প্রদায় ও সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে তাদের প্রকৃত বাস্তবতা ও অবস্থান—যার উদাহরণ সামনে আসছে।

প্রথমে দেওবন্দীদের কথিত ‘সরকারি’ আকীদাগত অবস্থানের কিছু উদাহরণ দেখা যাক। এগুলো এমন যে, কেউ না জানলে মনে করতে পারে এগুলো আহলুল হাদীস আলেমদের লেখা; অথচ এগুলো দেওবন্দীদেরই বক্তব্য।

সরফরাজ খান সফদর দেওবন্দী হায়াতী (মৃ. ১৪৩০ হিজরী)

তিনি তাঁর রাহে সুন্নত [راه سنت] গ্রন্থের ১১৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশেষ করে এই ক্ষেত্রে সাহাবীর—অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ رضي الله عنه-এর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু আমরা যখন উলূমুল হাদীসের দিকে তাকাই, তখন মারফূ‘—অর্থাৎ নবী ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত—বর্ণনা এবং মাওকূফ বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য উপেক্ষা করা যায় না। যেসব বর্ণনা মারফূ‘, সেগুলোর যে মর্যাদা প্রাপ্য, শুধু সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছানো মাওকূফ রেওয়ায়াতকে—যদিও তা সহীহ হয়—সেই মর্যাদা দেওয়া যায় না।”»

মন্তব্য: তাহলে কি দেওবন্দীরা ঐশী নস তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দলীল উপস্থিত থাকলে সাহাবীদের তাকলীদ না করার পক্ষে? যদি তাই হয়, তাহলে কি তারা আবু হানীফা رحمه الله অথবা তাঁর চেয়েও মর্যাদায় নিম্ন অন্য কোনো ব্যক্তির তাকলীদও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঐশী দলীলের উপস্থিতিতে না করার পক্ষে?

যদি না হয়, তাহলে কেন নয়?

আবু হানীফা رحمه الله কি সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে বড় মুজতাহিদ, ফকীহ বা ইমাম ছিলেন? অথবা আবু হানীফা رحمه الله কি সাহাবীদের চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত ছিলেন? কিংবা আবু হানীফার رحمه الله দব্‌ত ও ‘আদালাহ কি সাহাবীদের চেয়ে বেশি ছিল?

যেহেতু ‘সহীহ’ মাওকূফ রেওয়ায়াতগুলো মারফূ‘ হাদীসের মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে না, তাহলে ইমাম আবু হানীফা رحمه الله-এর বক্তব্য এবং হানাফী মাযহাবের বক্তব্যের মর্যাদা কী—যার অধিকাংশ, যদি পুরোপুরি না-ও হয়, আবু হানীফা رحمه الله পর্যন্ত পৌঁছানো কোনো ‘সহীহ’ সনদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং অধিকাংশ সনদ বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল, এবং তার সঙ্গে রয়েছে দুর্বল কিয়াস ও এমন সব মানুষের মতামত, যারা একজন সাহাবীর তুলনায়ও অনেক নিম্ন মর্যাদার?

সাহাবায়ে কেরাম ও নবী ﷺ-এর বক্তব্য উপস্থিত থাকা অবস্থায় কেউ কি অন্ধভাবে হানাফী মাযহাব আঁকড়ে ধরতে পারে? এর ইসলামী বিধান কী?

দেওবন্দীদের শায়খুল হাদীস ও শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (মৃ. ১৩৩৯ হিজরী)

তিনি তাঁর তাকারীর শায়খুল হিন্দ (تقارير شيخ الهند) গ্রন্থের ৩০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“সাহাবীর আমলের ক্ষেত্রে তা আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয় (অর্থাৎ তা আমাদের জন্য হুজ্জাহ নয়)।”»

শায়খ মাহমুদুল হাসান তাকারীর শায়খুল হিন্দ, পৃষ্ঠা ৪৩-এ একটি বিষয় সম্পর্কে বলেন:

«“এটি মূলত একজন সাহাবীর বক্তব্য। অতএব হানাফীদের বিরুদ্ধে এটিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।”»

দারুল উলূম দেওবন্দের পিতা ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (মৃ. ১৩২৫ হিজরী)

তিনি তাঁর বায়ান-ই-মুকাদ্দিমাহ মারযাআই আল-বাহাওয়ালপুরী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৫-এ লিখেছেন:

«“সাহাবীর বক্তব্য আমাদের কাছে সেইভাবে দলীল নয়, যেভাবে নবী ﷺ-এর বক্তব্য দলীল।”»

দেওবন্দী আলেম ও তাঁদের ইমাম খলীল আহমদ সাহারানপুরী (মৃ. ১৩৪৬ হিজরী)

তিনি আবু দাউদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ বাযলুল মাজহূদ [بذل المجهود], ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯-এ একটি বিষয়ে বলেন:

«وهو مذهب الصحابي لا يقوم بحجة على أحد»

“এটি মূলত একজন সাহাবীর মাযহাব, যা কারও ওপর বাধ্যতামূলক নয়।”
মন্তব্য: যদি একজন সাহাবীর মাযহাব কারও ওপর বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে আবু হানীফা رحمه الله-এর মাযহাব কীভাবে কারও ওপর বাধ্যতামূলক হতে পারে?

তিনি একই গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ৩৮ পৃষ্ঠায় অন্যত্র লিখেছেন:

«“এটি মূলত আবু হুরাইরাহ رضي الله عنه-এর বক্তব্য। অতএব এটি অনুসরণ করার মতো দলীল নয়।”»

হানাফী-বেরেলভী ও দেওবন্দীদের ইমাম মোল্লা আলী আল-কারী (মৃ. ১০১৪ হিজরী)

তিনি তাঁর আল-মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ [مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح], ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৯-এ লিখেছেন:

«“এটি একজন সাহাবীর মাযহাব, যা আমাদের ওপর হুজ্জাহ নয়।”»

আধুনিক যুগের দেওবন্দী ফিকহের ইমাম জাফর আহমদ উসমানী থানভী (মৃ. ১৩৯৪ হিজরী)

তিনি তাঁর ফিকহের বিশ্বকোষ ই‘লাউস সুনান, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৮-এ লিখেছেন:

«“মারফূ‘ হাদীসের তুলনায় সাহাবীর বক্তব্য হুজ্জাহ নয়।”»

মন্তব্য: উপরের বক্তব্যগুলোর পাশাপাশি আরও প্রশ্ন রয়েছে—‘হুজ্জাহ’ তথা অনুসরণযোগ্য দলীল বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? হানাফী মাযহাবে কে তা নির্ধারণ করে?

আবু হানীফা رحمه الله-এর প্রতিটি বক্তব্যকে তাঁর অন্ধ অনুসারীদের জন্য ‘হুজ্জাহ’ হিসেবে কে নির্ধারণ করেছে?

তাঁর সেই একনিষ্ঠ মুকাল্লিদরাই তো তা নির্ধারণ করেছে, যারা মূলত অজ্ঞতার কারণে অন্ধভাবে অনুসরণ করছিল।

এ অবস্থায় এমন একদল মানুষের মতামতের আইনগত মূল্য কী, যারা নিজেরাই ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে কোনো গ্রহণযোগ্য মতামত দেওয়ার যোগ্য নয়?

আধুনিক যুগের দেওবন্দী ইমাম ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি তাকী উসমানী

তিনি তাঁর দরসে তিরমিযী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৯-এ আবু হুরাইরাহ رضي الله عنه-এর একটি রেওয়ায়াত সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি ফজরের সালাতে কুনূত পড়তেন। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাকী উসমানী বলেন:

«“এই রেওয়ায়াতটি মাওকূফ এবং এটি আমাদের জন্য দলীল নয়।”»

তাকী উসমানী দরসে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৯-এ আরও বলেন যে, হানাফীরা এর জবাব এভাবে দিয়েছে:

«“এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত নয়। আর যা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত নয়, সেখানে সাহাবীর বক্তব্য বা আমল গ্রহণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।”»

মন্তব্য: সংক্ষেপে, দেওবন্দীর বক্তব্য হলো—সব বিষয়ে অনুসরণের মানদণ্ড স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবী নন।

তিনি এই দাবিতে কতটা সত্যবাদী, তা নিচে দেখা যাবে।

তিনি দরসে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১-এ আরও বলেন:

«“অতএব এর জবাব হবে—এটি ইবনু উমর رضي الله عنه-এর আমল ও ইজতিহাদ। এ বিষয়ে কোনো মারফূ‘ হাদীস বর্ণিত হয়নি। উপরন্তু, সাহাবীর ইজতিহাদ হুজ্জাহ নয়, বিশেষত যখন অন্যান্য সাহাবী থেকে এর বিরোধী রেওয়ায়াতও রয়েছে।”»

বর্তমান যুগের দেওবন্দী মুফতী জামিল আহমদ নজীরী

তিনি তাঁর রাসূলুল্লাহ ﷺ কা তরীকায়ে নামায গ্রন্থের ২৫৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“স্বীকার করা হয় যে, কিছু সাহাবী এক বিতর পড়তেন এবং এ বিষয়ে রেওয়ায়াতও পাওয়া যায়। কিন্তু এটি ছিল তাঁদের নিজস্ব ইজতিহাদ। আর নবী ﷺ থেকে বর্ণিত বহু মারফূ‘ রেওয়ায়াতের বিরোধী হওয়ার কারণে এ ধরনের ইজতিহাদকে হুজ্জাহ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।”»

মন্তব্য: তাহলে দেওবন্দীরা কেন এত ভণ্ডামি করে আহলুল হাদীসের ওপর তীব্র আক্রমণ করে—যখন আহলুল হাদীস বলে যে, নবী ﷺ-এর বিরোধী হলে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য—এমনকি কোনো সাহাবীর বক্তব্যও—গ্রহণ করা যাবে না?

তারা কি আবু হানীফা رحمه الله-এর ইজতিহাদের ক্ষেত্রেও সাহাবীদের ক্ষেত্রে যে একই বিধান প্রয়োগ করে, তা প্রয়োগ করে?

যদি করে থাকে, তাহলে শুধু আবু হানীফা رحمه الله-এর ইজতিহাদ নয়, তাঁর পুরো মাযহাবের ক্ষেত্রেও কেন একই নীতি প্রয়োগ করে না?

সরফরাজ খান সফদর

তিনি তাঁর আহসানুল কালাম ফি তারকিল কিরাআতি খালফ [أحسن الكلام في ترك القراءة خلف], ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪২-এ লিখেছেন:

«“ইমামের পেছনে ফাতিহা পাঠের ব্যাপারে উবাদাহ ইবনুস সামিত رضي الله عنه-এর হাদীসটি তিনি সঠিকভাবে বুঝেছিলেন কি না, তা যাই হোক—এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, উবাদাহ رضي الله عنه ইমামের পেছনে ফাতিহা পড়তেন। এটি ছিল তাঁর অবস্থান এবং তাঁর গবেষণা তাঁকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। এটিই ছিল তাঁর মাযহাব। কিন্তু কোনো সাহাবীর বুঝ এবং সাহাবী থেকে বর্ণিত মাওকূফ রেওয়ায়াত আমাদের জন্য হুজ্জাহ নয়, বিশেষত যখন তা কুরআন, সহীহ হাদীস এবং অধিকাংশ সাহাবীর বিরোধী হয়।”»

অন্যত্র সরফরাজ খান সফদর তাঁর খাযায়িনুস সুনান [خزائن السنن], যা জামি‘ আত-তিরমিযীর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪-এ লিখেছেন:

«“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আয়িশাহ رضي الله عنها মৃতদের শোনার সক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কালিমায়ে শাহাদাত পড়েছি এবং তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, মৃতরা শুনতে পারে। তাহলে এখন আমরা কাকে অনুসরণ করব—নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে, নাকি সাহাবী আয়িশাহকে?”»

মন্তব্য: আপনি কি আবু হানীফা رحمه الله ও তাঁর মাযহাবের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করেন, নাকি তাঁরও কালিমা পড়েছেন?
আপনি কি একমত যে, কেউ যদি নবী ﷺ-এর বিরোধিতা করে অন্য কারও বক্তব্য গ্রহণ করে, তাহলে এটি নবী ﷺ ছাড়া অন্য কারও কালিমা পাঠ করার সমতুল্য?

যে ব্যক্তি এমন কাজ করে, তার ব্যাপারে ইসলামী বিধান কী?

হায়! যদি একনিষ্ঠ হানাফী-দেওবন্দী ও বেরেলভীরা সাহাবায়ে কেরাম رضي الله عنهم أجمعين এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষেত্রে একই সৌজন্য দেখাত—যখন তাদের মাযহাব কোনো সহীহ হাদীস অথবা সাহাবীদের কোনো হাদীসের বিরোধিতা করে, তখন তারা যেন নিজেদের মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ অব্যাহত না রাখত।

আশরাফ আলী থানভী (মৃ. ১৩৬২ হিজরী)-এর খলীফা আবদুল মাজীদ দারিয়াবাদী দেওবন্দী (মৃ. ১৩৯৭ হিজরী)

তিনি তাঁর হাকীমুল উম্মত গ্রন্থের ২৭৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের ইজতিহাদের ক্ষেত্রে ভুল থেকে মুক্ত ছিলেন না। যদিও এটি স্বীকৃত যে, অন্যান্য নেককার আলেমগণ মর্যাদার দিক থেকে সাহাবীদের চেয়ে নিম্নস্তরের।”»

উপরের বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, হানাফী-দেওবন্দীরা নিজেরাই এবং তাদের পূর্ববর্তী আলেমরা বলেছেন—কোনো সাহাবীর বক্তব্য যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মারফূ‘ হাদীসের বিরোধী হয়, তাহলে তা পরিত্যাগ করতে হবে।

কিন্তু আহলুল হাদীস অতীত ও বর্তমানকালে যখন একই কথা বলেছে, তখন তারা মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এই বলে যে, আহলুল হাদীস সাহাবীদের বিরোধী এবং সাহাবীদের অনুসরণ না করার কারণে তারা ক্ষুদ্র বা নিম্নস্তরের শিয়াদের মতো।

অথচ সবাই জানে যে, আহলুল হাদীসই কুরআন ও সুন্নাহকে সাহাবায়ে কেরামের বুঝ অনুযায়ী এবং এই উম্মতের সালাফে সালেহীনের পদ্ধতিতে বোঝার প্রচার করে। তাঁরা কারও অন্ধ তাকলীদ করেন না।

অন্যদিকে দেওবন্দী ও বেরেলভীরা স্পষ্টভাবেই নিজেদের ইমামদের বক্তব্য আঁকড়ে ধরেছে—শুধু সাহাবায়ে কেরামের বিরোধিতা করেই নয়, বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের বিরোধিতা করেও।
📄 সাহাবায়ে কেরামকে আক্রমণ এবং হানাফিদের অবস্থান।
🖋️ আবু হিব্বান ও আবু খুযাইমাহ আনসারী।

দেওবন্দীদের সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের বর্ণিত রিওয়ায়াতসমূহের প্রতি অবস্থানের ‘বাস্তবতা’—যার মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি তাঁদের কটূক্তি ও আক্রমণও অন্তর্ভুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে আমরা বলি, সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে মন্দ কথা বলার ক্ষেত্রে হানাফি-দেওবন্দীরা অগ্রভাগে রয়েছে। ফলে তারা শুধু শিয়াদের সঙ্গে সাদৃশ্যই রাখে না; বরং কার্যত শিয়াদের জন্য সহায়কও হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এসব করেছে তাদের মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য; কারণ কোনো সাহাবির রিওয়ায়াত তাদের মাযহাবের মতের বিরোধী হয়ে যেতে পারে।

দেওবন্দী মাহমুদুল হাসান তাঁর তাকরীরাতুশ শাইখিল হিন্দ গ্রন্থের ১৩৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সম্পর্কে হানাফিরা বলে থাকে:

«“তিনি এমন একজন নারী ছিলেন, যিনি তর্কপ্রবণ এবং কথাবার্তায় লাগামহীন ছিলেন।”»

হানাফিদের উসূলের গ্রন্থ নূরুল আনওয়ার, পৃষ্ঠা ১৮৩ এবং উসূলুশ শাশী, পৃষ্ঠা ৮৫-তে বলা হয়েছে:

«“আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ ছিলেন না। আর তাঁর রিওয়ায়াত যদি কিয়াসের বিরোধী হয়, তাহলে তা পরিত্যাগ করা হবে।”»

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি হানাফিরা এই কটূক্তি করেছে তাঁর বর্ণিত মুসাররাহর হাদিসের কারণে। এই হাদিসটি মুত্তাফাকুন আলাইহি। এর সারকথা হলো—কোনো ব্যক্তি যখন কোনো পশু বিক্রি করবে, তখন তার দুধ দোহন না করে এমনভাবে রাখা উচিত নয়, যাতে ক্রেতার কাছে মনে হয় যে পশুটির ওলান প্রকৃতপক্ষে যতটুকু দুধ উৎপাদন করে তার চেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন করে। যদি এমনটি করা হয় এবং ক্রেতা পশুটির দুধ দোহন করে ফেলে, তাহলে তার পশুটি ফেরত দেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং এর সঙ্গে এক সা‘ পরিমাণ খেজুর ফেরত দিতে হবে; অথবা সে পশুটি নিজের কাছে রাখতে পারে।

এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হানাফিরা আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই বক্তব্যের পেছনের যুক্তি বা কিয়াস বুঝতে পারেনি—যে পশু ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি বিক্রেতাকে এক সা‘ খেজুরও দিতে হবে। ফলে তাঁর সহিহ হাদিসটি প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের একটি পথ খুঁজে বের করতে হয়েছে। আর তা করার একমাত্র উপায় ছিল হাদিসের ইমাম ও সাহাবি আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যক্তি ও মর্যাদাকে আক্রমণ করা, যাতে তাদের মাযহাবের অবস্থান রক্ষা করা যায়।

তারা ভুলে যায় যে, ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো একই ফতোয়া দিয়েছিলেন। উপরে বর্ণিত তাদের এই প্রতারণার বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা কি প্রশ্ন করার সাহস করতে পারি না যে, যদি আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ না হন এবং তিনি যদি সুস্পষ্ট যুক্তি ও কিয়াসের বিরোধী কথা বলতেন, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) অথবা অন্য কেউ কীভাবে ফকিহ হতে পারেন?

এই কারণেই হানাফি মাযহাব ও ফিকহের গ্রন্থসমূহে এসব নীতিমালা আজও একের পর এক সংস্করণে পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে এবং হানাফি মাযহাবের শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে এগুলো পড়ানো হচ্ছে। শত শত বছর আগে করা এসব বক্তব্য থেকে কোনো কিছু বাদ দেওয়া হয়নি এবং কোনো প্রত্যাহারও করা হয়নি।

আমাদের শাইখ, হাফিজ সানাউল্লাহ যাহিদী ইবনু ইমামুদ্দীন (হাফিযাহুল্লাহ), নূরুল আনওয়ার-এর সমালোচনা ও পর্যালোচনায় গ্রন্থটির ওপর বিস্তারিত টীকা লিখেছেন। ৩য় খণ্ডের ২৪৫-২৪৬ পৃষ্ঠায় তিনি প্রায় আঠারোজন হানাফি ইমাম ও ফকিহের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যারা সাহাবি আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ ছিলেন না—এই মত পোষণ করতেন। ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

এছাড়াও আমাদের শাইখ যুবাইর আলী যাঈ (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ১৪৩৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, তাঁর রচনাসমূহ দেখা যেতে পারে। তিনি এক জায়গায় অন্তত একচল্লিশটি সাহাবির বক্তব্য সংকলন করেছেন, যেখানে দেওবন্দীরা নিজেদের মাযহাব—অর্থাৎ ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য স্পষ্টভাবে সাহাবিদের বিরোধিতা করেছে। আমরা আশা করি, এই প্রবন্ধের পরবর্তী কোনো অংশে আমরা এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করব।

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পাশাপাশি অন্যান্য সাহাবিকেও সমালোচনা

হানাফিরা শুধু আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সমালোচনায় থেমে থাকেনি; বরং অন্যান্য সাহাবিকেও সমালোচনা করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, নামাজের কাতারে পা-এর সঙ্গে পা এবং গোড়ালির সঙ্গে গোড়ালি মিলিয়ে দাঁড়ানোর রিওয়ায়াতটি আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়ে আমীন সাফদার ওকরভী দেওবন্দী (মৃত্যু ১৪২১ হিজরি) তাঁর হাশিয়াহ তাফহীমুল বুখারি আলা সহিহিল বুখারি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮০-তে লিখেছেন:

«“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময়ে আনাস এমন একজন বালক ছিলেন, যে বালেগ হয়নি এবং তিনি পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন।”»

আমীন ওকরভী আরও লিখেছেন:
«“আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং তিনি যা করেছিলেন, তা তাঁর শিশুকালের কাজ ছিল। তিনি অন্য শিশুদের সঙ্গে শুধু তা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু যখন তিনি বড় হলেন, তখন অন্যান্য সাহাবি ও তাবিয়িরা তাঁর শৈশবকালের সেই কাজের কারণে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।”»

মন্তব্য: এখানে আমরা আবারও দেখতে পাচ্ছি—সহিহ বুখারিতে কোনো সাহাবির মাধ্যমে বর্ণিত এমন একটি রিওয়ায়াত, যার বিরুদ্ধে অন্য কোনো সাহাবি আপত্তি করেননি, সেটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং রাবিকে ‘শিশু’ বলে হেয় করা হচ্ছে, যেন তাঁর বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা যায়।

অথচ এই রিওয়ায়াত এবং এর অনুরূপ রিওয়ায়াত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া অন্য সাহাবিরাও বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে সাহাবি আবু আবদুল্লাহ নু‘মান ইবনু বশীর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-ও রয়েছেন, যা সহিহ বুখারিতে রয়েছে।

অতএব আবারও সাহাবায়ে কেরামের দবত (সংরক্ষণশক্তি ও নির্ভুলতা) এবং আদালত (বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতা)-এর ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে, কারণ তাঁদের অবস্থান ‘কথিতভাবে’ আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবের বিরোধী।

এই প্রতারণার পর্দা ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে।

রফউল ইয়াদাইন এবং ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

সহিহ বুখারিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) কর্তৃক বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত উত্তোলন—অর্থাৎ রফউল ইয়াদাইন-এর হাদিস সম্পর্কে আমীন ওকরভী আবারও তাঁর হাশিয়াহ তাফহীমুল বুখারি আলা সহিহিল বুখারি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৫-তে লিখেছেন:

«“তবে ইমাম বুখারি এই অধ্যায়ের অধীনে কোনো মুহাজির বা আনসারি সাহাবির কাছ থেকে হাদিস আনেননি। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছ থেকে একটি রিওয়ায়াত এনেছেন, যিনি অল্পবয়সী ছিলেন অথবা সিগার সাহাবি—অর্থাৎ ছোট সাহাবি—ছিলেন এবং পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন। আর তিনি মালিক ইবনুল হুয়াইরিসের কাছ থেকেও একটি রিওয়ায়াত এনেছেন, যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে মাত্র বিশ রাত অবস্থান করেছিলেন।”»

ওকরভী তাঁর তাজাল্লিয়াতে সাফদার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪-তে আরও লিখেছেন:

«“একইভাবে ইমাম বুখারি কোনো বদরি সাহাবির কাছ থেকে কিছুই বর্ণনা করেননি—অর্থাৎ এমন কোনো সাহাবির কাছ থেকে, যিনি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বরং তিনি শিশুসুলভ ইবনু উমর এবং এমন একজনের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি মাত্র বিশ রাত মেহমান হিসেবে অবস্থান করেছিলেন [মালিক ইবনুল হুয়াইরিস]। তিনি রফউল ইয়াদাইনের হাদিস নয়টি ভিন্ন স্থানে অসম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন।”»

ওয়াইল ইবনু হুজর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারেও আমীন ওকরভী তাঁর তাজাল্লিয়াতে সাফদার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪-তে লিখেছেন:

«“ইমাম মুসলিম আরও এক ধাপ এগিয়ে এই দুজন—মালিক ইবনুল হুয়াইরিস এবং আবদুল্লাহ ইবনু উমর—এর সঙ্গে তৃতীয় একজন সাহাবিকেও যুক্ত করেছেন, যিনি ওয়াইল ইবনু হুজর নামে কেবল একজন সফরকারী ছিলেন।”»

এটি দেওবন্দী ইমামের—শুধু ইমাম বুখারি (রহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর আল-জামিউস সহিহ-এর প্রতিই নয়, বরং সাহাবায়ে কেরামের প্রতিও—বিদ্বেষ প্রকাশ করে। তিনি তাঁদের নিয়ে উপহাস করেন, তাঁদের শুধু শিশু হিসেবে উল্লেখ করেন, তাঁদের সঠিক ও নির্ভুলভাবে বর্ণনা না করার কথা বলেন। তাঁর কাছে ব্যাপারটি এমন যেন ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রহিমাহুমাল্লাহ)-এর মতো মুহাদ্দিসগণ শুধু অল্পবয়সী সাহাবিদের কাছ থেকে হাদিস বেছে নিয়েছেন! ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

আমরা প্রশ্ন করি, যদি সাহাবায়ে কেরাম সঠিকভাবে বর্ণনা না করে থাকেন অথবা তাঁরা কেবল এমন ভ্রমণকারী হয়ে থাকেন, যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে অল্প সময় কাটিয়েছেন, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) কি নবী ﷺ-এর সঙ্গে এর চেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছিলেন?

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই একই সাহাবিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাঁদের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন এবং তাঁদের ছাত্রদের রফউল ইয়াদাইন শিক্ষা দিয়েছেন ও নিজেরাও তা আমল করেছেন। অন্ধভাবে তাকলিদকারী হানাফিরা এই তথ্যগুলোর কী করবে?

আর হানাফিরা যে চল্লিশজন আলেমের ‘স্বর্ণকমিটি’র কথা দাবি করে, যারা নাকি হানাফি মাযহাবের মেরুদণ্ড গঠন করেছিলেন—তাঁদের বয়স কত ছিল? তাঁদের কেউ কেউ প্রায় তিন বছরের এবং কেউ পাঁচ বছরের মতো বয়সী ছিলেন। অথচ তাঁদের ওই বয়সেই ফতোয়া প্রদানকারী এবং একটি মাযহাব প্রণয়নকারী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে!

আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) অথবা তাঁর ছাত্ররা কি ‘বদরি সাহাবি’ ছিলেন?

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্মৃতিশক্তি নিয়ে আপত্তি

সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাকার হানাফি ইমাম বদরুদ্দীন আইনি (মৃত্যু ৮৫৫ হিজরি) তাঁর উমদাতুল কারি শরহু সহিহিল বুখারি, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯১-এ “তাকবিরের পর কী বলা হবে”—এই অধ্যায়ের অধীনে লিখেছেন:

«ويحتمل يكون أنس نسى في تلك الحال لكبر سنه وقد وقع مثل هذا كثيرا»

«“সম্ভবত ওই অবস্থায় আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর বৃদ্ধ বয়সের কারণে ভুলে গিয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে।”»
মন্তব্য: সুতরাং লক্ষ করুন, দেওবন্দীরা সাহাবায়ে কেরাম থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণিত রিওয়ায়াতকে পাশ কাটানোর জন্য শুধু তাঁদের ‘শিশু’ বলে অভিহিত করে না—যাঁরা পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন বলে দাবি করা হয়—বরং সাহাবিদের স্মৃতিশক্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁদের ভুলোমনা বলে আখ্যায়িত করে।

অথচ ইমাম মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ১৪২০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, সহিহ বুখারির একটি হাদিসের সনদে থাকা ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম নামের একজন রাবির সমালোচনা করার কারণে আক্রমণের শিকার হন। তিনি সাহাবি ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ)-এর সময়কার একজন রাবি!

বেরেলভি শাইখুল হাদিস গোলাম রাসূল সাঈদী তাঁর শরহু সহিহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৫৪-তে লিখেছেন:

«“সম্ভবত ইমাম দারাকুতনী (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ৩৮৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছ থেকে বর্ণনাটি তাঁর বৃদ্ধ বয়সে গ্রহণ করেছিলেন। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বৃদ্ধ বয়সে মানুষ ভুলে যাওয়ার প্রবণতার শিকার হয়।”»

অতএব আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে হাদিসটি হানাফি মাযহাবের বিরোধী, সেটি খণ্ডন করার জন্য হানাফি আলেমরা শুধু সাহাবিদের আদালত-কেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না; বরং তাঁদের দবত-কেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে, নিজেদের মাযহাব রক্ষার জন্য।

এটি যদি সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অবমাননা না হয়, তাহলে আর কী?

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে আল-কাওসারীর বক্তব্য

আবার আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে বিদআতের জন্য প্রসিদ্ধ ব্যক্তি যাহিদ হাসান আল-কাওসারী (মৃত্যু ১৩৭১ হিজরি) তাঁর তানীবুল খতীব, পৃষ্ঠা ৮০-তে এবং আবদুল্লাহ কুদ্দুস খান কারান দেওবন্দীর দ্য আপরাইট ডিফেন্স অব আবু হানিফা, পৃষ্ঠা ২১৩-তে লিখেছেন:

«“এছাড়াও মাথা চূর্ণ করার বর্ণনার ক্ষেত্রে রাবি হলেন একমাত্র আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু), এবং তিনি এটি তাঁর বৃদ্ধ বয়সে বর্ণনা করেছেন। একইভাবে সাহাবিদের উটের প্রস্রাব পান করার বর্ণনাটিও তিনি একাই বর্ণনা করেছেন। আবু হানিফার (রহিমাহুল্লাহ) মত হলো—নিশ্চয়ই সাহাবায়ে কেরাম ন্যায়পরায়ণ [আদিল], কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা মানুষ এবং সাধারণ মানুষ। কখনো কখনো বৃদ্ধ বয়সের কারণে তাঁরা যা শুনেছিলেন তা সংরক্ষণ ও নির্ভুলভাবে বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়তেন। এই দিক থেকে তাঁরা ভুল থেকে মুক্ত নন। এমন কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের বর্ণনা যদি ফিকহের আলেমদের বক্তব্যের বিরোধিতা করে, তাহলে ফিকহের আলেমের বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি যদি বৃদ্ধ বয়সে বর্ণনা করার কারণে ভুল বুঝে থাকেন, তাহলে যে ব্যক্তি তাঁর বিরোধিতা করেন এবং বয়সে তাঁর চেয়ে কম, তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করা হবে।”»

এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, হানাফিরা শুধু সেই সাহাবিদের নির্ভুলতাকে আক্রমণ করছে না, যাঁরা আমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন; বরং তারা আরও বলছে যে, সাহাবির বক্তব্য যদি ‘কোনো ফকিহের বক্তব্যের বিরোধী হয়’, তাহলে তা পরিত্যাগ করা হবে। এই বিষয়ে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই—এ বক্তব্য নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ ছিলেন না?

হানাফি ফিকহের ইমাম মোল্লা জিওয়ান (মৃত্যু ১১৩০ হিজরি), যার বক্তব্য আমীন সাফদার ওকরভী তাঁর ফুতুহাতে সাফদার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২-তে উদ্ধৃত করেছেন, আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে লিখেছেন:

«غير معرف ولاجتهاد»

অর্থাৎ:

«“তিনি তাঁর ফিকহ, দ্বীনের বুঝ অথবা ইজতিহাদের জন্য পরিচিত ছিলেন না।”»

ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

আমীন সাফদার ওকরভী দেওবন্দী তাঁর নিজস্ব ফিকহের গ্রন্থ থেকে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করার পরও বলেন:

«“এই বক্তব্যটি এমন লোকেরা ব্যবহার করেছে, যারা দাবি করে যে নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন এবং আমাদের কথা শুনতে পারেন না। আর নির্দিষ্ট একজন মাওলানা ইউনুস নুমানী দেওবন্দী (মৃত্যু ১৪৩৪ হিজরি) যদি নিজেই মিম্বারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতেন যে তাঁর কোনো ফিকহ নেই, অথবা নিজেকে এমন ব্যক্তি বলতেন যে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নন কিংবা তাঁর কোনো ইজতিহাদ নেই—তাহলে তোমরা তাঁর সম্পর্কে এমন কথা কেন বলবে না, যা একজন সাহাবির ব্যাপারে বলা হচ্ছে?”»

বিতর্ক আরও এগিয়ে যায়। ইউনুস নুমানী, যিনি নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন এবং মানুষের উত্তর শোনেন না—এ মত পোষণ করতেন; তাঁর সমসাময়িক দেওবন্দী আমীন সাফদার ওকরভী, যিনি নবী ﷺ জীবিত এবং শুনতে পারেন—এ মত পোষণ করতেন। ওকরভী তাঁর ফুতুহাতে সাফদার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২-৩৮৩-তে লিখেছেন:

«“প্রিয় ভাইয়েরা! এই বক্তব্যে মাওলানা [সাফদার ওকরভী] বড় ধরনের ভুল করেছেন। তিনি আমার প্রতি এমন কথা আরোপ করেছেন যে, আমি নাকি কোনো সাহাবিকে আদিল মনে করি না; বরং ফাসিক মনে করি। অথচ আমি শুধু নূরুল আনওয়ার থেকে এবং উসূলুশ শাশী থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি। সেখানে যা লেখা আছে, আমি শুধু তা দেখিয়েছি। মাওলানার উচিত ছিল আমাকে জিজ্ঞেস করা—এসব কোথায় লেখা আছে; আমি তাঁকে দেখিয়ে দিতাম। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি এসব বক্তব্য আমার
দিকে সম্বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বোকা বানানোর চেষ্টা করেছেন।»

«“বিষয়টি যদি কোনো গায়রে মুকাল্লিদ, সালাফি করত, তাহলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু এমন একজন ব্যক্তি এটি করেছেন, যিনি নিজেকে হানাফিয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন এবং হানাফি মাযহাবের একজন স্পষ্ট অনুসারী। তিনি বলেছেন, আমি নাকি এই সাহাবি সম্পর্কে বলেছি যে তিনি তাঁর ফিকহ ও ইজতিহাদের জন্য পরিচিত ছিলেন না। তাহলে আমি প্রশ্ন করি—এই হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলো কি তোমরাও গ্রহণ করো না?»

«“জেনে রাখো, যদি আমাদের নূরুল আনওয়ার ও উসূলুশ শাশী গ্রন্থে লেখা থাকে যে, আনাস [ইবনু মালিক]-এর রিওয়ায়াত কিয়াসের বিরোধী হলে কিয়াসকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তাহলে আমাকে কেন দোষ দেওয়া হচ্ছে?”»

সুবহানাল্লাহ! উপরের দুই হানাফি-দেওবন্দী আলেমের পারস্পরিক বিতর্কের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন এবং দেখুন, তারা কীভাবে সাহাবায়ে কেরামকে অবমাননা করেছে। বরং লক্ষ্য করুন, তাদের মাযহাবের গ্রন্থগুলোতেই কীভাবে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বক্তব্য এসেছে!

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হানাফি-দেওবন্দীদের মধ্যে সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং তাঁদের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য রয়েছে। অথচ তারাই আবার আহলুল হাদিস আলেমদের বিরুদ্ধে সুন্নাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি অবমাননাকারী হওয়ার অভিযোগ করে—বিশেষ করে সহিহ বুখারির হাদিস দুর্বল করার অভিযোগে।

কিন্তু তারাই শুধু উপরে উল্লিখিতভাবে সহিহ বুখারির বহু হাদিসকে পাশে সরিয়ে দেয়নি; বরং সহিহ বুখারির হাদিসের বর্ণনাকারী প্রকৃত সাহাবায়ে কেরামকেই সমালোচনা করেছে এবং ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রহিমাহুমাল্লাহ)-কেও হাদিসের আলেম হিসেবে উপহাস করেছে।

এটাই দেওবন্দীদের বাস্তবতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে সৎ না থাকার একটি দৃষ্টান্ত।

এতসব কিছুর পর ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতো ব্যক্তিকে কীভাবে আক্রমণ করা যায়—তা সত্যিই বোধগম্য নয়!

আরও অনেক কিছু বলা সম্ভব; কিন্তু তাহলে এটি একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ না হয়ে একটি বিশাল গ্রন্থে পরিণত হবে। পরবর্তীতে দেওবন্দীরা প্রকৃতপক্ষে সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করে, সে বিষয়ে আরও প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-কে আক্রমণের প্রসঙ্গ

হানাফিরা যখন একটি ধোঁয়ার পর্দা সৃষ্টি করে এবং সহিহ বুখারির কিছু অ-মারফু‘ মু‘আল্লাক রিওয়ায়াতকে আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) দুর্বল বলেছেন—এই কারণে তাঁকে আক্রমণ করে, তখন এ বিষয়ে অনেক কিছু বলা যেতে পারে।

তবে এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো হানাফি মাযহাবের প্রকৃত অবস্থা এবং তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস ও সেই হাদিসগুলো আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া বর্ণনাকারী—অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম—সম্পর্কে কী বলে, তা তুলে ধরা।

আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) কেন সহিহ বুখারির কিছু রিওয়ায়াতকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে সংযুক্ত নয় বলে মনে করেছেন—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোচনা। এ বিষয়ে তাঁর সালাফ বা পূর্বসূরি ছিলেন, তাঁর সঙ্গে আমরা একমত হই বা দ্বিমত হই—তা আলাদা বিষয়।

আমাদের অনেক আলেমই এ বিষয়ে ইমাম আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেওবন্দীরা এখন কেন এটি সামনে নিয়ে এসেছে?

আমরা বলি, এর কারণ একটাই—সহিহ বুখারি এবং অন্যান্য হাদিসগ্রন্থ সম্পর্কে দেওবন্দীরা প্রকৃতপক্ষে কী বিশ্বাস করে, তা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন ছিল। এখন মানুষ ধীরে ধীরে তাদের প্রকৃত বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে পারছে—সহিহ বুখারি এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে সম্পর্কিত হাদিস সম্পর্কে তারা কী ধারণা রাখে।

এটি আড়াল করার জন্যই তারা এখন পাল্টা আক্রমণ হিসেবে ইমাম আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-কে আক্রমণ করার পথ বেছে নিয়েছে।

সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে হানাফিদের বিশ্বাস কী?

তাহলে সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে হানাফিরা কী বিশ্বাস করে?

নিচে হানাফিদের সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বক্তব্যের মাত্র কয়েকটি উদ্ধৃতি দেওয়া হলো।

লেখক পীর সৈয়দ মুশতাক আলী শাহ দেওবন্দী তাঁর তারজুমাতুল আহনাফ, পৃষ্ঠা ১১৯-এ নারী সাহাবি ফাতিমা বিনতে কায়স (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সম্পর্কে লিখেছেন:

«“আল্লাহই জানেন, তিনি তাঁর কথায় সত্যবাদী ছিলেন, নাকি মিথ্যাবাদী ছিলেন।”»

আউযুবিল্লাহ!

এটি যদি শিয়াদের, কাদিয়ানিদের এবং অন্যান্যদের অনুকরণে সাহাবায়ে কেরামের আদালত ও বিশ্বস্ততার ওপর আক্রমণ না হয়, তাহলে আর কী?

দেওবন্দীদের হাদিসের আলেম এবং বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ আমীন সাফদার ওকরভী দেওবন্দী তাঁর তাজাল্লিয়াতে সাফদার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫২-তে, যা পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে ইশাআতুল উলূমিল হানাফিয়্যাহ কর্তৃক প্রকাশিত; এবং তাঁর জুযউল কিরাআতি বি হাশিয়াহ, পৃষ্ঠা ১৩১-এ লিখেছেন:

«“আর এই উবাদাহ মাজহূলুল-হাল, মীযানুল ই‘তিদাল।”»

এখানে আমীন ওকরভী সাহাবি উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কথা বলছেন, যিনি সহিহ বুখারিতে “সূরা ফাতিহা ছাড়া সালাত নেই”—এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন।
এখানে আমীন ওকরভী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একজন সাহাবিকে ‘মাজহূল’ বা অজ্ঞাতপরিচয়/অবস্থা-অজ্ঞাত বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ আহলুস সুন্নাহর ইজমা হলো—প্রত্যেক সাহাবি ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত।

«أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ عَلَى أَنَّهُمْ كُلُّهُمْ عُدُولٌ»

“আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মত হলো—তাঁরা সকলেই ন্যায়পরায়ণ।”

আমাদের কাছে কোনো সাহাবির অবস্থা বা জীবনী বিস্তারিতভাবে জানা আছে কি না—তা এখানে কোনো বিষয়ই নয়। কারণ তাঁরা সকলেই মূলত ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত হিসেবে স্বীকৃত।

কিন্তু এখানে হাদিসটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, যা হানাফি মাযহাবের বিরোধী, এই ব্যক্তি সাহাবি উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে ‘মাজহূলুল-হাল’ বলেছেন—অর্থাৎ এমন একজন ব্যক্তি, যার পরিচয় ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আমরা জানি না। আউযুবিল্লাহ!

আমাদের শাইখ যুবাইর আলী যাঈ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর মাসআলাতু ফাতিহাতি খালফাল ইমাম, পৃষ্ঠা ২৬-এ দেওবন্দী আমীন সাফদার ওকরভীর এই বক্তব্যের মন্তব্যে লিখেছেন:

«“লক্ষ্য করা উচিত, এই দেওবন্দী আমীন ওকরভী সাহাবি উবাদাহ ইবনুস সামিতকে ‘মাজহূলুল-হাল’ বলার জন্য যে মীযানুল ই‘তিদাল-এর রেফারেন্স দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, মীযানুল ই‘তিদালে উবাদাহ ইবনুস সামিতকে ‘মাজহূলুল-হাল’ বলা হয়নি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।”»

আরেকজন প্রসিদ্ধ দেওবন্দী, হুসাইন আহমাদ থানভী দেওবন্দী তাঁর তাওযীহুত তিরমিজি, পৃষ্ঠা ৪৩৬-এ, যা কলকাতা, ভারতের মাদানী মিশন বুক ডিপো থেকে প্রকাশিত, লিখেছেন:

«“আর এই উবাদাহ ইবনুস সামিত ‘আন‘আনা’ করেছেন এবং তিনি একজন মুদাল্লিস। আর মুদাল্লিসের ‘আন‘আনা’ গ্রহণযোগ্য নয়।”»

ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

এই অজ্ঞ দেওবন্দী একজন সাহাবিকে ‘মুদাল্লিস’ বলেছেন। অথচ মুসলিমদের মধ্যে কেউই সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে এমন কিছু বলেনি—তাঁরা সবাই ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত, এবং দ্বীন সংরক্ষণ ও তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের আদালত ও দবত প্রশ্নাতীত।

এখানে তাঁকে ‘মুদাল্লিস’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেন কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে তা প্রকাশ করেন না। হাদিসশাস্ত্রের নীতিমতে, কোনো মুদাল্লিসের ‘আন‘আনা’ তখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ না তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে তিনি যাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করছেন তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন।

কিন্তু উবাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ওপর এ ধরনের বিধান আরোপ করা যায় না। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবি। কোনো সাহাবির বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না; বিশেষ করে উবাদাহ ইবনুস সামিতের মতো একজন বড় সাহাবির ক্ষেত্রে তো নয়ই।

অতএব আমরা আমাদের শিক্ষকের বক্তব্য অনুযায়ী বলি—এটি শুধু সাহাবি উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি অবমাননাই নয়; বরং তাঁর সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট বানোয়াট ও মিথ্যা অভিযোগ, যার উদ্দেশ্য হলো ইমামের পেছনে ফাতিহা না পড়ার হানাফি মাযহাবকে রক্ষা করা।

মুকাল্লিদ কি নিজের মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য সাহাবায়ে কেরামের অবমাননা পর্যন্ত করতেও কোনো সীমা মানবে না?

ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সম্পর্কে একটি স্বপ্নের দাবি

দেওবন্দীদের আলেম ফজলুর রহমান গঞ্জ মুরাদাবাদী (মৃত্যু ১৩২৩ হিজরি) তাঁর মালফুজাতে থানভী, ২৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৪-এ লিখেছেন:

«“রাতে আমি স্বপ্নে ফাতিমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এবং তিনি আমাকে নিজের বুকের কাছে টেনে জড়িয়ে ধরেছেন, ফলে আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি।”»

অর্থাৎ এই দেওবন্দী আলেম দাবি করেছেন যে তিনি ফাতিমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরেছেন। ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

কল্পনা করুন, কেউ যদি এই দেওবন্দী আলেমকে বলত—“আমি আপনার বোন অথবা আপনার মায়ের সঙ্গে স্বপ্নে সাক্ষাৎ করেছি এবং তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন”—তাহলে তিনি কী বলতেন?

আবু মাহযুরাহ সম্পর্কে হিদায়ার বক্তব্য

দেওবন্দী ইমাম তাকী উসমানী তাঁর দরসে তিরমিজি, মাকতাবা দারুল উলূম, করাচি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫৫-তে হিদায়া নামক প্রাচীন হানাফি গ্রন্থের একটি বক্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন:

«“তবে হিদায়ার লেখক এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, তিনি আবু মাহযুরাহ সম্পর্কে মনে করতেন যে তাঁর বুঝ দুর্বল এবং সন্দেহনির্ভর ছিল। এটি সঠিক নয়।”»

অতএব তাকী উসমানী স্বীকার করছেন যে, হিদায়ার লেখক—যে গ্রন্থটি প্রত্যেক হানাফি জ্ঞানার্থীর জন্য একটি প্রাচীন ও বহুলপঠিত গ্রন্থ এবং যার লেখক মুল্লা মুরগিনানী হানাফি—সৈয়দ আবু মাহযুরাহ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। আর তাকী উসমানীর মতে, এটি সঠিক নয়।

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং কাতারে পা মিলানো

আমরা সহিহ বুখারিতে আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিস জানি।

কিতাবুস সালাত/আযান, হাদিস ৭২৫-এ ইমাম বুখারি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন:

«إِلْزَاقِ الْمَنْكِبِ بِالْمَنْكِبِ وَالْقَدَمِ بِالْقَدَمِ فِي الصَّفِّ»

অর্থাৎ:

«“কাতারে কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এবং পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে দাঁড়ানো।”»
এই রিওয়ায়াতকে উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেওবন্দী আমীন ওকরভী তাঁর হাশিয়াহ তাফহীমুল বুখারি আলা সহিহিল বুখারি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮০-তে, মাকতাবা মদিনা, লাহোর কর্তৃক প্রকাশিত সংস্করণে লিখেছেন:

«“ইমাম বুখারি আনাস থেকে রিওয়ায়াত করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময়ে আনাস বালেগ হননি এবং তিনি পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন। আর বুখারি আনাসের সম্পূর্ণ বক্তব্যও উদ্ধৃত করেননি। আনাসের শিক্ষক আবু বকর ইবনু আবি শাইবা (মৃত্যু ২৩৫ হিজরি) বলেছেন:»

«‘আনাসকে বলা হয়েছিল—তুমি যদি আজও আগের মতো তোমার পা মিলিয়ে দাঁড়াও, তাহলে লোকেরা—অর্থাৎ সাহাবি ও তাবিয়িরা—বন্য খচ্চর যেমন একে অপরের কাছ থেকে পালিয়ে যায়, তেমনি তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যাবে।»

«“সুতরাং স্পষ্ট যে, একজন মানুষ যখন বড় হয়, তখন তার মধ্যে কিছু বুদ্ধি বিকশিত হয় এবং সে ছোটবেলায় যা করত তা ছেড়ে দেয়। আনাস ছোটবেলায় যা করতেন, তা তিনি শিশুদের সঙ্গে করতেন। কিন্তু যখন তিনি বড় হলেন, তখন সাহাবি ও তাবিয়িরা আনাসের এই অভ্যাসে অসন্তুষ্ট হন। অতএব স্পষ্ট যে, তাঁর কাছে পা মিলানো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহও নয় এবং সাহাবিদের সুন্নাহও নয়। যদি এটি সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হতো, তাহলে সাহাবি ও তাবিয়িরা কখনোই এই অভ্যাস বা সুন্নাহর কারণে অসন্তুষ্ট হতেন না।’”»

কিন্তু আমরা জানি, আমীন ওকরভীর বক্তব্য সহিহ মুসলিমে আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিজের বর্ণনার বিরোধী।

সহিহ মুসলিম, কিতাবুল আশরিবা, “যে ব্যক্তি পান করবে তার ডান পাশের ব্যক্তিকে পানি, দুধ ইত্যাদি প্রদান করা মুস্তাহাব”—অধ্যায়, হাদিস ২০২৯(বি)-তে আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন:

«قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ وَأَنَا ابْنُ عَشْرٍ وَمَاتَ وَأَنَا ابْنُ عِشْرِينَ»

অর্থাৎ:

«“নবী ﷺ যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন আমার বয়স ছিল দশ বছর। আর তিনি যখন ইন্তেকাল করেন, তখন আমার বয়স ছিল বিশ বছর।”»

অতএব ওকরভীর আনাসকে ‘অল্পবয়সী শিশু’ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময়ে বালেগ হননি—এভাবে অভিহিত করা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। কারণ আমরা সহিহ মুসলিমের মাধ্যমে জানি, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের সময় আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বয়স ছিল বিশ বছর।

ওকরভী আনাসের ওপর মিথ্যা আরোপ করেছেন এবং সহিহ মুসলিমের হাদিসের বিরোধিতা করেছেন। তিনি শুধু নিজের মাযহাবকে রক্ষা করার জন্যই এমন করেছেন—অর্থাৎ নামাজে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে চার হাত পরিমাণ জায়গা রাখার হানাফি মতকে রক্ষা করার জন্য, যার কোনো ভিত্তি নেই।

আগের উদ্ধৃতিতে তিনি যে কথাটি বলছেন—আনাস যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এভাবে দাঁড়াতেন, তাহলে সাহাবিরা ও তাবিয়িরা অসন্তুষ্ট হতেন—এটিও প্রমাণহীন। কারণ আনাস ইবনু মালিক বা অন্য কারও কাছ থেকে এমন কোনো সহিহ রিওয়ায়াত নেই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর আনাসকে বলা হয়েছিল, “তুমি এখন বড় হয়ে গেছ; আজ যদি এভাবে পা মিলিয়ে দাঁড়াও, তাহলে আমরা খচ্চরের মতো তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যাব।”

আমীন ওকরভীর নিজের বক্তব্যও দেখা যেতে পারে। তিনি তাঁর তাজাল্লিয়াতে সাফদার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৬ এবং ফুতুহাতে সাফদার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০-তে লিখেছেন:

«“বিখ্যাত হানাফি ফিকহের গ্রন্থ নূরুল আনওয়ার সাহাবি মু‘আবিয়াকে অজ্ঞ বলেছেন।”»

সাহাবায়ে কেরাম ও হানাফিদের বিষয়ে আরও অনেক কিছু বলা হবে। কিন্তু আপাতত এতটুকুই যথেষ্ট—জেনে রাখা দরকার যে, নিজেদের মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য হানাফিরা সাহাবায়ে কেরামকে কোনোভাবেই সমালোচনা থেকে রেহাই দেয়নি। অথচ তারাই সহিহ বুখারির হাদিস সম্পর্কে কথা বলার কারণে আহলুল হাদিসের আলেমদের আক্রমণ করে।
হানাফিদের কি স্বতন্ত্র উসুলে হাদিস আছে?

মূল : ইয়াভুজ কোক্তাশ
তর্জমা : মুহাম্মদ শরিফ

[লেখক ইয়াভুজ কোক্তাশ ১৯৬৯ সালে তুরস্কের ত্রাবজোন প্রদেশের ওফে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ত্রাবজোন ইমাম-হাতিপ হাইস্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৩ সালে দোকুয এইলুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১৯৯৬ সালে একই অনুষদে তাফসির বিষয়ে মাস্টার্স এবং ১৯৯৯ সালে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদিস বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৯৫ সালে রাইজে একাডেমিক কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ২০০৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক ও ২০১০ সালে অধ্যাপক হন। বর্তমানে তিনি রজব তৈয়ব এরদোগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজে অধ্যাপনা করছেন। হাদিস, সুন্নাহ, আধুনিক হাদিস-চিন্তা ও হাদিসের ব্যাখ্যাপদ্ধতি নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। তাঁর রচনাগুলোর মধ্যে ‘হাদিসের ইতিহাস ও উসুল’, ‘উসুলে হাদিস বিষয়ক প্রবন্ধ’, ‘সমকালীন হাদিসের সমস্যাবলি’, ‘কুরআনের বিরোধী মনে হওয়া হাদিস’, ‘আধুনিক সময়ে হাদিসের প্রতিরক্ষা’, ‘হাদিস ও ব্যাখ্যা’, ‘হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বিতর্ক’, ‘আধুনিক হাদিসের ব্যাখ্যা ও বিতর্ক’ এবং ‘প্রথম যুগের সুফি ও হাদিস’ উল্লেখযোগ্য। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক।

বর্তমান লেখাটি তিনি ৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন। দরসখানার পাঠকদের জন্য লেখাটি তর্জমা করেছেন মুহাম্মদ শরিফ]

*

‘হানাফি’ উসুলে হাদিসের পুনর্নির্মাণ করতেছে—এ ধরনের কিছু চিন্তাভাবনা দেখলাম। সেখান থেকেই মূলত এই লেখার অবতারণা। আমার সারকথা হইল, হানাফি উসুলে হাদিস বলতে কোনো চিজ নাই। উসুলে হাদিস আছে; কিন্তু উসুলে হাদিসের হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি বা মালেকি সংস্করণ নাই। বাকি হানাফিদের হাদিস-বোঝাপড়া, হাদিসের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মুহাদ্দিসদের থেকে যেসব জায়গায় তারা আলাদা—সেসব নিয়ে আলাপ করা যায়। একটু পরেই সেখানে আসছি। ইতিহাসের দিকে তাকাইলে, হানাফিরা একটা উসুলে হাদিসের কিতাব লিখছে—এমন নজির কি দেখা যায়? মোল্লা আলী কারীর মতো একজন হানাফি, একজন শাফেয়ি মুহাদ্দিসের লেখা কিতাবের শরাহ করেছেন। একইভাবে লখনৌভির মতো একজন হানাফি ‘যাফারুল আমানী’ নামে শাফেয়ি একজন আলেমের লেখা কিতাবের শরাহ করেছেন।

কিন্তু উপরোক্ত দাবিটা কেন উঠল আসলে? নিচে এই বিষয়ে আমাদের চিন্তাগুলি পয়েন্ট আকারে তুলে ধরতেছি—

১. এই দাবির পিছনে দুইটা কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, আবদুল মাজীদ তুর্কমানী তার কিতাবের নাম ‘দিরাসাত ফি উসুলিল হাদিস ফি মানহাজিল হানাফিয়্যা’ রাখছেন। এই নাম থেকেই অনেকে হানাফিদের স্বতন্ত্র একটা উসুলে হাদিস আছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাইছেন। অথচ এই কিতাব মূলত হানাফিদের উসুলে ফিকহের কিতাবগুলোতে ছড়ায়ে-ছিটায়ে থাকা তথ্যের সংকলন। ফলে ‘হানাফি উসুলে হাদিস’ বলতে আসলে হানাফিদের উসুলে ফিকহে থাকা হাদিস-বোঝাপড়াই উদ্দেশ্য। এদিকে উসুলে ফিকহের কিতাবগুলোতে হাদিসের আলোচনার কারণ তো স্পষ্টই; ইজতেহাদ ও ইস্তেম্বাত। অর্থাৎ, ‘উসুলে হাদিস’ নামে যে বিষয়টা উসুলে ফিকহে আলোচিত হয়, তার কারণ হইল—এটা ইজতেহাদে সহায়ক। এক অর্থে বললে, এখানে উসুলে ফিকহ হইল উদ্দেশ্য, আর উসুলে হাদিস হইল মাধ্যম (আলাত)।

২. হানাফি উসুলে হাদিসের কথা বলার পিছনে আমার মতে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা কারণ হইল—এটা সালাফিদের জবাব হিসেবে হাজির হইছে। এই অর্থে ‘হানাফি উসুলে হাদিস’ এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল বহিঃপ্রকাশ। বিশেষত কিছু সহিহ হাদিসের ওপর আমল না করার কারণে সালাফিরা হানাফিদের উপর যে চাপ দিত, তাতে হানাফিরা অনেকটা এই অবস্থান নিতে বাধ্য হইছে যে, “আমাদেরও নিজস্ব একটা উসুলে হাদিস আছে; অতএব আমরা কোনো কারণ ছাড়াই হাদিসের ওপর আমল করি না—বিষয়টা এমন না।” এই জায়গায় তো হানাফিরা ঠিক আছেন। তবে এটাকে ‘হানাফি উসুলে হাদিস’ নামে প্রকাশ করার কোনো দরকার নাই। হানাফিদের ‘হাদিস-বোঝাপড়া’, ‘হাদিসের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’—এতটুকু বললেই যথেষ্ট। তা না করলে স্বাভাবিকভাবেই শাফেয়ি, হাম্বলি ও মালেকি উসুলে হাদিসের কথাও সামনে আসবে; অথচ এমন কোনো জিনিসের অস্তিত্বই নাই।

৩. শাফেয়ি, হাম্বলি যখন বললাম, তখন আরেকটা কথা বলে রাখা দরকার। আজকাল কেউ কেউ বলেন, বর্তমানে যে উসুলে হাদিস প্রচলিত আছে, আসলে সেটা শাফেয়ি উসুলে হাদিস। আবার অল্প কিছু মানুষ এমনও বলতে পারেন যে, আজকের ইসলামিক স্টাডিজগুলোতে যে উসুলে হাদিস পড়ানো হয়, সেটা মূলত হাম্বলি উসুলে হাদিস। কিন্তু এসব কথা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে না; বরং হানাফি-শাফেয়ি-হাম্বলি আলাদা আলাদা উসুলে হাদিস আছে—এই বিভাজনটাকেই আরো গভীর করে।

আসল কথা হইল, উসুলে হাদিস হইল মুহাদ্দিসদের, কিংবা (তুরাসি অর্থে) আহলে হাদিসদের উসুল; কোনো নির্দিষ্ট ফিকহি মাজহাবের নিজস্ব উসুল না।
🥰1
বিষয়টা কি একটু লক্ষ করার মতো না? ‘শাফেয়ি উসুলে হাদিস’ বলতে আমরা যা বুঝি, তার মধ্যে মূলত খবরে ওয়াহেদের পক্ষে ইমাম শাফেয়ির সাফাই এবং উসুলে ফিকহে হাদিস-সংক্রান্ত যেসব আলোচনা তিনি করেছেন, সেগুলাই সামনে আসে। অর্থাৎ শাফেয়িও উসুলে হাদিসকে স্বতন্ত্র কোনো উদ্দেশ্য হিসেবে দাঁড় করাননি; ফিকহি ইজতেহাদের কাজে লাগানোর জন্যই এগুলোকে ব্যবহার করেছেন। হানাফিদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। এককথায়, উসুলে ফিকহ ছিল উদ্দেশ্য, আর হাদিস-সংক্রান্ত এসব উসুলি আলোচনা ছিল সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছার মাধ্যম।

আরেকটা ব্যাপার আরো মজার। আহমদ ইবনে হাম্বল তো একেবারে পুরোদস্তুর মুহাদ্দিস। অথচ তাঁরও স্বতন্ত্র অর্থে কোনো ‘হাম্বলি উসুলে হাদিস’ নাই। তাঁর পরের হাম্বলি আলেমরাও আলাদা করে কোনো হাম্বলি উসুলে হাদিস রচনা করেননি। এর সুনির্দিষ্ট কারণ আমি জানি না। তবে এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, আহমদ ইবনে হাম্বল হাদিসের বাইরে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কিতাব রচনা করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। মানে একেবারে খাঁটি সালাফি অ্যাপ্রোচ বলা যায়!

এরপর শাফেয়ি ও আহমদ ইবনে হাম্বলের সম্পর্কের একটা ঘটনা দেখেন। শাফেয়ি যখন কোনো হাদিসের সহিহ হওয়া নিয়ে নিশ্চিত হতে পারতেন না, কিংবা কোনো হাদিসের ব্যাপারে তাঁর কাছে যথেষ্ট তথ্য থাকত না, তখন আহমদ ইবনে হাম্বলের কাছে গিয়ে বলতেন—“আপনারা আমাদের চেয়ে হাদিস ও রাবিদের ব্যাপারে বেশি জানেন। আমাদেরকে সহিহ হাদিসটা বলে দিন, আমরা সেটার ওপর আমল করব।”

অর্থাৎ, হাদিসের সিহহত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ফকিহ শাফেয়ি মুহাদ্দিস আহমদ ইবনে হাম্বলের ওপর নির্ভর করতেন।

আবার অন্যদিকে, আহলে রায়দের সঙ্গে বিতর্কের ময়দানে আহলে হাদিসরা যখন কিছুটা অসহায় অবস্থায় পড়ছিল, তখন উসুল ও ইজতেহাদের ক্ষেত্রে শাফেয়ির কাছ থেকে উপকার নিয়েছেন আহমদ ইবনে হাম্বল। তাঁরই ভাষায়—“আমরা ইমাম শাফেয়ির মজলিসে বসার আগ পর্যন্ত উমুম-খুসুস কী তা জানতাম না। তাঁর মজলিসে বসার পরই আমরা উমুম-খুসুস শিখলাম।”

তাহলে বিষয়টা দাঁড়াইল কী? হাদিস জানার ক্ষেত্রে শাফেয়ি আহমদ ইবনে হাম্বলের মুখাপেক্ষী, আবার নস থেকে হুকুম বের করার উসুলি পদ্ধতিতে আহমদ ইবনে হাম্বল শাফেয়ির কাছ থেকে শিখছেন। এই সম্পর্কটাকে ‘শাফেয়ি উসুলে হাদিস’ বা ‘হাম্বলি উসুলে হাদিস’—এই ধরনের আলাদা আলাদা মাজহাবি উসুলে ভাগ করে ফেললে আসল বাস্তবতাটাই আর ধরা পড়ে না।

৪. হাদিসের উসুল নিয়ে যারা কিতাব লিখছেন, তাদের নব্বই শতাংশই শাফেয়ি। পাঁচ শতাংশ মালেকি; আর ইবনে রজবকে ধরলে পাঁচ শতাংশ হাম্বলি। তো পরিস্থিতি যদি এমনই হয়, তাহলে ইতিহাসে কখনো কারো মাথায় কি এই প্রশ্ন আসছে যে, ‘এই যে উসুলে হাদিস—এটা তো শাফেয়ি উসুল’?

যেমন, ইবনুস সালাহ, ইরাকি কিংবা ইবনে হাজার যখন উসুলে হাদিসের কিতাব লিখছেন, তখন কি কেউ সেগুলোকে ‘এটা তো একজন শাফেয়ির উসুলে হাদিস’—এইভাবে দেখছে? কিংবা কাজি ইয়াজ যখন ‘আল-ইলমা’ লিখছেন, তখন কি কারো মাথায় আসছে—‘এটা তো মালেকি উসুলে হাদিস’? কেউই এমন বলেনি। কারণ সোজা কথা হইল—শাফেয়ি উসুলে হাদিস, হাম্বলি উসুলে হাদিস বা মালেকি উসুলে হাদিস—এই নামে কোনো জিনিসই নাই।

৫. হানাফিদের ‘উসুলে হাদিস’ বলতে যে জিনিসটা বোঝানো হয়, তার আশি শতাংশই আসলে খবরে ওয়াহেদের সঙ্গে তার চেয়ে শক্তিশালী দলিলের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা। অর্থাৎ, হানাফিরা কতয়ি ও যন্নির মধ্যকার সম্পর্কটাকে একটা সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনছেন। এটা পুরোপুরিই একটা ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি। ভুল কিছু না, অবশ্যই; কিন্তু এটাকে উসুলে হাদিস বলা ঠিক হবে না। ইমাম মালেকও খবরে ওয়াহেদের বিপরীতে আমলে আহলে মদিনাকে একটা মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এটাকে কি মালেকি উসুলে হাদিস বলা যাবে? না, এমন কোনো জিনিসই নাই। এটা পুরোপুরিই একটা ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি।



৬. খবর মূলত দুই প্রকার—মুতাওয়াতির ও আহাদ (হানাফিদের কাছে আবার তিন প্রকার…)। মুতাওয়াতিরের আলোচনা উসুলে হাদিসের কিতাবগুলোতে আছে। তবে মুতাওয়াতির আদৌ উসুলে হাদিসের বিষয় কি না, সেটাও বিতর্কের বিষয়। কারণ প্রকৃতপক্ষে মুতাওয়াতির এমন একটা বিষয়, যেটা নতুন করে গবেষণা বা যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না; জ্ঞানতাত্ত্বিক (Epistemological) দিক থেকে বরং এটা ইলমে কালামের বিষয় হওয়া উচিত ছিল। তাহলে বলা যায়, মুতাওয়াতির মূলত উসুলে হাদিসের বিষয় নয়। মুহাদ্দিসরা এ নিয়ে আলোচনা করেছেন—এটা হয়তো তাদের একটা দৃষ্টিভঙ্গি বা বোঝাপড়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু একে উসুল বলা যায় না।

৭. এই জায়গায় একটা বিষয় কি আমাদের ভাবা দরকার না? বিশেষত গাজালির পর থেকে উসুলে ফিকহে মানতেক ঢুকছে, আর কিয়াসের আলোচনা অনেক বিস্তৃতভাবে করা হইছে। এমনকি এর সঙ্গে লফজের দালালতের আলোচনাগুলাও যোগ করতে হবে। এখন এই কারণে কি ‘হানাফি মানতেকের উসুল’ বা ‘শাফেয়ি মানতেকের উসুল’—এই ধরনের কথা বলা যাবে? না। মানতেক কিংবা কিয়াস উসুলে ফিকহে আলোচিত হইছে ফিকহ ও ইজতেহাদে সহায়ক হওয়ার জন্য। অর্থাৎ, উসুলে ফিকহ হইল উদ্দেশ্য, আর মানতেক হইল মাধ্যম।
তাছাড়া মানতেকও তার পূর্ণাঙ্গ অবয়বসহ উসুলে ফিকহে আলোচিত হয় নাই। তাই ‘হানাফিদের মানতেক-বোঝাপড়া’ ইত্যাদি বলা যায়; কিন্তু ‘হানাফি মানতেকের উসুল’ কিংবা ‘হানাফিদের মধ্যে মানতেকশাস্ত্র’—এইভাবে বলা ঠিক হবে না।

৮. উসুলে হাদিস মূলত মুহাদ্দিসরা যা করছেন, তার ওপর দাঁড়ানো। আর উসুলে ফিকহে হাদিস নিয়ে যে আলোচনা আছে, সেটা ফকিহরা যা করছেন, তার ওপর দাঁড়ানো। মুহাদ্দিসদের কাজের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কিত দুইটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। প্রথমটা হইল :

ক. রাবিদের জরাহ ও তাদিল।

খ. রেওয়ায়েতগুলোর পারস্পরিক তুলনা।

আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল—কোনো হাদিস সহিহ না যয়িফ, সেটা নির্ধারণ করা।

এখন বলেন তো, হানাফিদের—এমনকি আবু হানিফাকেও—এই কাজগুলো করতে দেখা গেছে কি? আবু হানিফার কথা বাদই দিলাম, শাফেয়ি কি এই কাজগুলো করছেন? আবু হানিফা বা শাফেয়ি পাঁচ-দশজন রাবির জরহ-তাদিল করেছেন—এটা থেকে এমনটা বলা যায় না যে, তারা পদ্ধতিগতভাবে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উসুলে ফিকহের কিতাবগুলোতে হানাফিরা খবরে ওয়াহেদকে আলোচনার বিষয় বানিয়েছেন, কিন্তু সহিহ হাদিস নিয়ে আলাদা করে কাজ করেননি। হানাফিরা ইনকিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তাদের এই আলোচনা কখনোই মুহাদ্দিসদের আলোচনার মতো ছিল না। কারণ হানাফিদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ফিকহি; যতটুকু ফিকহে কাজে লাগে, ততটুকুই এর প্রয়োজন। এ কারণেই স্বতন্ত্র কোনো উসুলে হাদিস হানাফিদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। আর এ কারণেই হানাফিরাও শেষ পর্যন্ত মুহাদ্দিসদের উসুলে হাদিস অনুযায়ী সহিহ সাব্যস্ত হওয়া হাদিসগুলোকে বিবেচনায় নিতে বাধ্য হয়েছেন; এরপর সেগুলোর জবাব দিয়েছেন হয় জমা (সমন্বয়) করে, নয়তো নসখ কিংবা তারজিহের মাধ্যমে।

৯. এখানে আমার তহাবির কথা মনে পড়তেছে। তিনি প্রথমে শাফেয়ি ছিলেন, পরে হানাফি হইছেন। কিন্তু তাঁর সব কিতাবপত্র দেখলে দেখা যায়, খবরে ওয়াহেদের বিষয়টা বাদ দিলে, হাদিসের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনি মূলত মুহাদ্দিসদের মানদণ্ডই অনুসরণ করছেন। শাফেয়ি মাজহাব ছেড়ে হানাফি হওয়ার পর তিনি ‘হানাফি উসুলে হাদিস’ নামের কোনো কিছুর ভিত্তিতে কাজ করেননি। তাঁর কাছে কোনো হাদিস যদি মুহাদ্দিসদের মানদণ্ডে সহিহ সাব্যস্ত হয়, তাহলে তিনি অবশ্যই সেটাকে বিবেচনায় নিয়েছেন। আর একজন মুহাদ্দিসের কাজই তো এইটা। একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি লখনৌভির মধ্যেও দেখা যায়। মুরসাল ইত্যাদি কিছু বিষয়ে তিনি হানাফি দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণযোগ্য মনে করলেও, মূলত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মুহাদ্দিসদেরই দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ লখনৌভি নিজেই একজন ভালো মুহাদ্দিস ছিলেন।

১০. আমরা কি কখনো এই বিষয়টা ভেবে দেখছি? আকিদার কিতাবগুলোতে তো মাসাহের মতো ফিকহি বিষয়ও আলোচনা করা হয়। এগুলো যদি ফুরুয়ি বা শাখাগত মাসয়ালা হয়, তাহলে উসুলুদ্দিন—অর্থাৎ আকিদার কিতাবে এগুলোর কাজ কী? শুধু এগুলো আকিদার কিতাবে আছে—এটা দেখেই কি বলা যাবে যে, কালামের কিতাবগুলোতেও ফিকহ আলোচনা করা হয়? কখনোই না! কালামের কিতাব ফিকহি মাসয়ালা আলোচনার জন্য লেখা ফিকহের কিতাব না। কালামের কিতাবে ফিকহি মাসয়ালাগুলো আলোচিত হয় আকিদার মূলনীতির দিক থেকে। অর্থাৎ, সেখানে এগুলো মূল বিষয় না, বরং মাধ্যম; মূল উদ্দেশ্য হইল ঈমানের বিষয়টা।

বিষয়টা এমন—ফিকহি মাসয়ালা হিসেবে মাসাহের আলোচনা করার উদ্দেশ্য শুধু মাসাহের আমলি দিকটা বয়ান করা না; বরং মাসাহের বৈধতার হুকুমের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি—এই বিষয়টা প্রতিষ্ঠা করা। কারণ মোজার ওপর মাসাহ করা জায়েজ—এই হুকুমটা কতয়ি দলিল দ্বারা প্রমাণিত। এ বিষয়ে অনেক আলেম স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির পর্যায়ের। সুতরাং এখানে শুধু একটা আমলি রুখসতের কথা উল্লেখ করা উদ্দেশ্য না; বরং এই হুকুমটা যে অকাট্য, সেটাও স্পষ্ট করা উদ্দেশ্য। এই কারণে কেউ যদি এই হুকুম অস্বীকার করে—যেহেতু এর পক্ষে কতয়ি দলিল আছে—তাহলে সে কুফরে পতিত হবে। কিন্তু দ্বিতীয় দিকটা, অর্থাৎ আমল করার দিকটা আলাদা। কেউ যদি মোজার ওপর মাসাহ না করে, তাহলে শুধু এই কারণে সে কাফের হবে না; কারণ এটা আমলি তথা ফুরুয়ি মাসয়ালা। (বলে রাখা ভালো—এখানে সাঈদ ফুদা থেকে ইস্তেফাদা নেওয়া হয়েছে)। উসুলে ফিকহের কিতাবগুলোতে হাদিস-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর আলোচনা করাটাও ঠিক এই রকম।

১১. একজন হানাফি হিসেবে লখনৌভি ‘যাফারুল আমানী’ কিতাবে হাদিস সহিহ না যয়িফ—এই হুকুম দেওয়ার অধিকার কার, সে বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁর কথাটা এখানে তুলে দিতে চাই : “কোনো ফকিহ, মুতাকাল্লিম কিংবা কোনো সুফি হাদিসের সহিহ হওয়া সম্পর্কে কিছু বললে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এই বিষয়ে এখতিয়ার মুহাদ্দিসদের। কারণ ঘরের ভেতরের খবর ঘরের মালিকই ভালো জানে।”
❤2
ব্যস, বিষয়টা এইটুকুই। অবশ্য কোনো ফকিহ কোনো হাদিস সম্পর্কে কিছু বলতেই পারেন; সেটা তাঁর একটা দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে, কিন্তু উসুল হবে না। ব্যাপারটা কি মজার না? সুফিদেরও—বিশেষ করে ইবনে আরাবি ঘরানার—হাদিসের তাসহিহ ও তাজয়িফের ব্যাপারে কমবেশি কিছু বক্তব্য আছে। তাহলে এখন তাদের এই কাজকে কি আমরা ‘উসুলে হাদিস’ বলব?

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার—উসুলে হাদিস হইল পুরো উম্মতের এজমালি বা মুশতারাক উসুল। উম্মতের প্রত্যেক মাজহাবের আলেমেরই এতে কোনো না কোনো প্রভাব ও অবদান আছে। যেমন আহলে হাদিসগণ ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রভাবিত হইছে, তেমনি আহলে রায়রাও হাদিসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রভাবিত হইছে। আহলে হাদিসরা যখন বুঝতে পারল যে, তারা অতিরিক্ত সনদ ও রাবি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, ফলে মতনকে কিছুটা উপেক্ষা করছে, তখন ভারসাম্য আনার জন্য আহলে হাদিসদের মধ্য থেকেই ফকিহরা সামনে আসলেন। একইভাবে আহলে রায়রাও যখন বুঝতে পারল যে, তারা মতনের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে সনদ ও রাবির বিষয়গুলো—সংক্ষেপে বললে, সহিহ হাদিসের বিষয়টাকেই—কিছুটা উপেক্ষা করছে, তখন আহলে রায়দের মধ্য থেকেও মুহাদ্দিসরা সামনে আসলেন।

উপরের পুরো আলোচনা থেকে যে মৌলিক বিষয়টা সামনে আসে, তা হইল—হানাফিদের স্বতন্ত্র কোনো ‘উসুলে হাদিস’ ব্যবস্থা ছিল না, এই মতটাই আমার কাছে বেশি শক্তিশালী মনে হয়। এই হিসেবে হানাফিদের মধ্যে যা ছিল, তা মূলত হাদিসের প্রতি তাদের ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি। হানাফিরা হাদিস নিয়ে আলোচনা করার সময় মূলত ইজতেহাদ ও ফিকহি ইস্তেম্বাতের উদ্দেশ্য সামনে রাখছেন; হাদিসকে স্বতন্ত্র একটা শাস্ত্র হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা তারা করেননি। ফলে হাদিস নিয়ে হানাফিদের যে মূল্যায়ন, সেটা মূলত ফিকহি মাসয়ালায় দলিল হিসেবে হাদিস ব্যবহারের একটা কাঠামো; অন্যদিকে উসুলে হাদিস হইল স্বতন্ত্র একটা ইলম, যা মুহাদ্দিসদের সহিহ ও যয়িফ হাদিস নির্ধারণের পদ্ধতি থেকে গড়ে উঠছে।

ফলে শেষকথা হইল, ‘হানাফি উসুলে হাদিস’ কথাটা ঐতিহাসিক ও পদ্ধতিগত—দুই দিক থেকেই বিভ্রান্তিকর। এর চেয়ে সঠিক হইল, হানাফিদের হাদিসের প্রতি আলাদা ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে—এই কথাটা বলা। এই দৃষ্টিভঙ্গি সহিহ ও যয়িফ হাদিস নির্ধারণের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসদের পদ্ধতিকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে; নিজের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র কোনো উসুলে হাদিস দাঁড় করানোর দাবি করে না। সুতরাং হানাফিদের হাদিস-বোঝাপড়াকে উসুলে হাদিসের সামগ্রিক ও অভিন্ন কাঠামোর ভেতরে একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিত; কোনো নির্দিষ্ট মাজহাবের স্বতন্ত্র ‘উসুলে হাদিস’ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
❤1🥰1