সালাফি ARTICLE
1.51K subscribers
636 photos
20 videos
226 links
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

দ্বীনের সঠিক জ্ঞানের সমুদ্রে ডুব দিন,
আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জন করুন।
Download Telegram
ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ আশআরী নাকি সালাফী?

উত্তর: ইমাম ইবনে হাজার যদিও বেশ কিছু মাসআলায় আশআরী মতবাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন তবুও তিনি বহু মাসআলায় সালাফ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা ও মানহাজের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং আশআরী মতবাদের বিরোধিতা করেছেন। যেমন,

১- কুরআন ও সুন্নাহর নসকে বিবেকের যুক্তির ওপর প্রাধান্য দেয়ার মাসআলায় তিনি সালাফে সালেহীনের নীতি অবলম্বন করেছিলেন। অনুরূপভাবে তিনি সালাফে সালেহীনের নীতি অনুযায়ী এটা বিশ্বাস করতেন যে, স্পষ্ট বিবেকের যুক্তির সাথে বিশুদ্ধ হাদিসের কখনো বিরোধ হয় না। বরং সর্বদা মিলে যায়।

২- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, তাওহীদের তিনটি অংশ রয়েছে। তাওহীদ আর রুবূবিয়্যাহ, তাওহীদুল উলুহিয়্যা ও তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত।

৩- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহর পরিচিতি লাভ করার বিষয়টি মৌলিকভাবে মানুষের মাঝে ফিত্বরাত দ্বারাই হয়। অর্থাৎ স্বভাবজাত।

৪- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, মুকাল্লিদ বা অন্ধ অনুসারী ব্যক্তি যদি সন্দেহ ও সংশয় থেকে মুক্ত হয় তবে তার ঈমান বিশুদ্ধ।

৫- তিনি কালাম শাস্ত্রবিদদের সে নীতির বিরোধিতা করেছেন যাতে তারা বান্দাদের ওপর নযর বা সন্দেহ চিন্তা করা আবশ্যক করে দিয়েছিল এবং যারা মনে করেছিল যে মুকাল্লিদ এর ঈমান বিশুদ্ধ না। তাদের এ ভ্রান্ত নীতির তিনি বিরোধিতা করেছেন।

৬- তাকদীরের সংজ্ঞা ও তাকদীরের ওপর ঈমানের চারটি স্তরের ব্যাপারে তিনি সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

৭- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, বান্দার যাবতীয় কর্মের স্রষ্টা হচ্ছেন আল্লাহ্।

৮- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, মহান আল্লাহর সকল কর্মে হিকমত ও কারণ রয়েছে।

৯- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহর ওপর কোনো কিছু আবশ্যক নেই। তবে যদি তিনি নিজের ওপর কোনো কিছু আবশ্যক করে নেন।

১০- মৌলিকভাবে তিনি সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, মহান আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করতে হবে যেমনটি কুরআন ও সুন্নাহর দাবী। আর তা তাওকীফী বা কুরআন ও সুন্নাহ নির্ভর। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্যে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হওয়া ব্যতীত তা সাব্যস্ত করা যাবে না।

১১- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করার বিষয়টি তাঁর সত্তা সাব্যস্ত করার মতোই। সুতরাং যেভাবে তাঁর সত্তা অন্য কোনো সত্তার সাথে সাদৃশ্য দিয়ে সাব্যস্ত করা হয় না, তেমনি তাঁর গুণাবলিও অন্য কোনো সৃষ্টির গুণের সাথে সাদৃশ্য দিয়ে সাব্যস্ত করা হবে না।

১২- সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, ইবাদত বা দাসত্ব কেবল মহান আল্লাহর অধিকার। তাঁর কোনো শরীক নেই। সুতরাং এতে তাঁর সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার করা জায়েয হবে না, সে ব্যক্তি যত বড়ই হোক না কেন।

১৩- ঈমানের সংজ্ঞায় তিনি সালাফে সালেহীনের মতের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যে, ঈমান মুখের কথা, অন্তরের বিশ্বাস ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে সংঘটিত কর্মের নাম। যা আশআরী ও মাতুরিদিয়াদের নীতির বিরোধী।

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদা ও মানহাজের সাথে আরো একাত্মতা পোষণ করেছেন যে ঈমান বাড়ে ও কমে।

১৪- কালাম শাস্ত্রীয় লোক আশআরী ও মাতুরিদিয়াদের জাওহার ও আরদ্ব নীতির তিনি বিরোধিতা করেছেন। [ফাতহুল বারী, ১৩/৫০৭]

এসব থেকে বুঝা গেল যে ইমাম ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ কালাম শাস্ত্রবিদ আশআরী ও মাতুরিদিয়াদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। কারণ তিনি এমন সব বিষয়ে তাদের বিরোধিতা করেছেন যেগুলো তাদের মতবাদের মৌলিক বিষয় বলে তাদের কাছে স্বীকৃত।

তাছাড়া তিনি রাসূলের হাদিস ও সুন্নাত থেকে সন্দেহ সংশয় প্রতিরোধ করেছেন। সালাফে সালেহীনকে ভালোবাসতেন। বিদআতের নিন্দা ও প্রতিবাদ করতেন। বিদআতকারীদের ঘৃণা করতেন। কালাম শাস্ত্রবিদদের মতবাদ সম্পর্কে সাবধান করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর রয়েছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য অনেক ভাষ্য।

🖋️ শাইখ আবু বকর জাকারিয়া (হাফি.)
❤4
শাইখ আলবানীর মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা কেন শেষ হয়েছিল?

শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর মদিনা মুনাওয়ারা থেকে বিদায় নেওয়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই 'বহিষ্কার' ছিল না, যেমনটা কেউ কেউ অপবাদ দিয়ে থাকেন। বরং এর পেছনে বেশ কিছু বস্তুনিষ্ঠ কারণ নিহিত ছিল, যা নিচে তুলে ধরা হলো:

◾ভিন্নধর্মী পাঠদান ও ছাত্রদের বিপুল সাড়া: শাইখ আলবানী (রহ.) মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন বছর শিক্ষকতা করেন। তাঁর পাঠদানের ধরন ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী। তিনি কেবল প্রথাগত ক্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন না; বরং ক্লাসের আগে ও পরে ছাত্রদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, কখনো নিজের গাড়িতে করে তাদের নিয়ে যেতেন এবং হাদিসের বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিতেন। এর ফলে ছাত্রদের মাঝে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হয় এবং তাঁর দরসে ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ইলমি (জ্ঞানগত) প্রভাব অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে।

◾চুক্তি নবায়ন না হওয়া: শাইখের নিজস্ব বর্ণনা অনুযায়ী, ছাত্রদের এই বিশাল সমাগম ও তাঁর প্রতি এই আকর্ষণ কিছু শিক্ষকের মনঃপূত হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এমন কিছু রিপোর্ট পেশ করা হয়েছিল, যেখানে দেখানো হয় যে ছাত্ররা তাঁর চারপাশে সংঘবদ্ধ হয়ে একটি আলাদা 'দল' বা 'জোট' তৈরি করছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর চুক্তির মেয়াদ আর নবায়ন করা হয়নি এবং শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায (রহ.) তাঁকে বিষয়টি অবহিত করেন। (উল্লেখ্য, এই বর্ণনাটি শাইখ আলবানীর নিজস্ব বক্তব্য, স্বাধীন কোনো সূত্র দ্বারা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যৌক্তিক নয়।)

◾গবেষণায় আত্মনিয়োগের আকাঙ্ক্ষা: আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, তা হলো আলবানী মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সুন্নাহর খেদমতের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন এবং তিনি মনে করতেন যে হাদীসের কিতাবসমূহ তাহকীক, তাখরীজ ও অধ্যয়নের ক্ষেত্রই তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ময়দান। তাই গবেষণা, তাহকীক ও রচনার জন্য অবসর নেওয়া তাঁর ইলমী জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল এবং তাঁর পথচলা নিয়ে আলোচনা করার সময় এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।

কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে আরও সঠিক কথা হলো: বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাদান শেষ হওয়া চুক্তি নবায়ন না হওয়ার কারণেই ঘটেছিল, আর হাদীস, গবেষণা ও তাহকীকের জন্য অবসর নেওয়ার তাঁর ইচ্ছা ছিল এমন একটি বিষয় যা তাঁর ইলমী প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু এটিই তাঁর চুক্তি শেষ হওয়ার একমাত্র প্রমাণিত কারণ নয়।

◾সিরিয়ার কারাবাসের সাথে বিভ্রান্তি: অনেকেই এই ঘটনার সঙ্গে সিরিয়ায় শাইখ আলবানীর কারাবরণের ঘটনাকে গুলিয়ে ফেলেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। সিরিয়ায় তাঁর কারাবাসের ঘটনাটি ঘটেছিল ভিন্ন একটি সময়ে এবং মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর বিদায়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

এভাবেই সময়ের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে মহান একটি পর্যায় শেষ হয়; সেই পর্যায় থেকে এমন কয়েকজন ছাত্র বেরিয়ে আসেন যারা তাঁর হাদীসের পদ্ধতি বিভিন্ন দেশে বহন করে নিয়ে যান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদীস বিজ্ঞান শিক্ষাদান তাঁর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রসারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে ওঠে।

লেখক: রবের মুখাপেক্ষী বান্দা, মুহাম্মাদ আব্দুল লতিফ (প্রধান তত্ত্বাবধায়ক, ইমাম আলবানী ওয়েবসাইট)।
❤3🍓2
ডিএনএ টেস্টের ভিত্তিতে শরিয়া আইনে ধ*র্ষক হুজুরকে শাস্তি দেয়া সম্ভব কিনা এটা নিয়ে অনলাইনে তর্ক চলছে। কোনো কোনো ইসলামবিরোধী দাবি করছে ডিএনএ টেস্টের ভিত্তিতে শরিয়া আইনে নাকি শাস্তি দেয়া যায় না। তাদের এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। হ্যাঁ, ডিএনএ টেস্ট বা অন্য কোনো আধুনিক পদ্ধতিতে ধ*র্ষককে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা গেলে শরিয়া আইনের আওতায় "হদ" শাস্তি প্রয়োগ করা যায় না। কিন্তু শরিয়া আইনে এক্ষেত্রে উপযুক্ত "তাযির" বা দণ্ডগত শাস্তি প্রয়োগ করা যায়। রাবেতাহ আল আলম আল ইসলামী (ইসলামিক ফিকহ কাউন্সিল অব মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ) এর বক্তব্য অনুযায়ী অপরাধী চিহ্নিতকরণে ডিএনএ টেস্ট নাজায়েজ কিছু নয়। এর উপর ভিত্তি করে তাযির শাস্তি প্রয়োগ করা যায়। [১]

সাক্ষী পাওয়া না গেলে ফরেনসিক টেস্ট বা অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করে ধ*র্ষককে শণাক্ত করবার কথা উল্লেখ করেছেন সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলিম শায়খ আসিম আল হাকিম (হাফি.)। [২]

জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়ার মুফতী ও মুহাদ্দিস শায়খ শফিকুল ইসলাম (হাফি.) উল্লেখ করেছেন, কেবল সাক্ষী নয় বরং আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ডিএনএ টেস্টও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। [৩]

তাযির শাস্তি সম্পর্কে ইসলামবিরোধীরা নানা রকমের মন্তব্য করে। তাদের অনেককে বলতে দেখা যায় এটা নাকি খুব লঘু শাস্তি বা নামমাত্র শাস্তি যার দ্বারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় না! আমরা এখন যাচাই করে দেখবো তাদের দাবি কতোটুকু সঠিক।

তাযির শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে কিনা এ সম্পর্কে শায়খ ড. আব্দুল কারীম যাইদানের العقوبة في الشريعة الإسلامية (ইসলামী শরী‘আতে শাস্তির বিধান) গ্রন্থে 'তা‘যীর হিসেবে হ*ত্যা করা' অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছেঃ
.
"তা‘যীর শাস্তি হিসেবে অপরাধীকে হ*ত্যা করা যদি অত্যাবশ্যক হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে হ*ত্যা করা ব্যতীত অন্য কোনো উপায় না থাকে, এমতাবস্থায় বিশুদ্ধ বিবেচনা মতে হ*ত্যা করা বৈধ। সুন্নতে নববী থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কেউ যদি তোমাদের একক নেতৃত্বে ফাটল ধরাতে বা দলের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টি করতে তৎপর হয়, তবে তাকে হ*ত্যা কর।”

এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যার ফিৎনা-ফাসাদ ও সন্ত্রা*সী কর্মকাণ্ড থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য তাকে হ*ত্যা করা ব্যতীত অন্য কোনো পথ না থাকে তাকে হ*ত্যা করা বৈধ। অপর এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যার মদ্যপান করার অভ্যাস কোনো ক্রমেই বন্ধ করা যায় না। জবাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি এহেন কাজ থেকে বিরত না হয় তাকে হ*ত্যা কর।” [৪]

এ থেকে বোঝা গেলো ইসলামী শরিয়া আইনে ক্ষেত্রবিশেষে বিচারক কর্তৃক তাযিরের ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড দেবার অবকাশ রয়েছে।

ইসলামবিরোধীরা দাবি করে হাদিসে নাকি ১০ বেত্রাঘাতের চেয়ে বেশি তাযির শাস্তি দিতে নিষেধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তারা এই হাদিসটি দেখায়ঃ

" আবু বুরদা(রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী(ﷺ)বলতেনঃ আল্লাহর নির্ধারিত হদ সমুহের কোনো হদ ব্যতিত অন্য ক্ষেত্রে দশ কশাঘাতের ঊর্ধ্বে দণ্ড প্রয়োগ করা যাবে না।" [৫]

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন হাজার আসকালানী(র.) তাঁর সুবিখ্যাত 'ফাতহুল বারী' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,

"...এখানে "হুদুদ" শব্দ দ্বারা উদ্যেশ্য হলো আল্লাহর ঐ সমস্ত হক যা আদেশ ও নিষেধের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন [আল্লাহর] এই বাণীর উদ্যেশ্যঃ “আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ (হুদুদ) লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। (বাকারাহ ২২৯)”। এবং এই বাণীতেওঃ “যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ (হুদুদ) অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে (সুরা তালাক্ব ১)”। এবং এই বাণীতেওঃ “এগুলো আল্লাহর সীমারেখা (হুদুদ) । কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ে না (সুরা বাকারাহ ১৮৭)”। এবং এই বাণীতেওঃ “আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা (হুদুদ) লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন (সুরা নিসা ১৪)”। এবং তিনি বলেন, দশের বেশি বেত্রাঘাত করা যাবে না ঐ সমস্ত শাস্তিদানের ক্ষেত্রে যা গুনাহের সাথে সম্পৃক্ত না। যেমন পিতা তার ছোট শিশুকে শিক্ষাদানের উদ্যেশ্যে শাস্তি দেয়া।”" [৬]

অর্থাৎ এ থেকে বোঝা গেলো আলোচ্য হাদিসে “حُدُودِ اللَّهِ” (হুদুদিল্লাহ) দ্বারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সীমা লঙ্ঘনের অপরাধ অর্থাৎ অনেক বড় ধরণের অপরাধ ব্যতিত অন্য অপরাধে ১০ বেত্রাঘাতের বেশি শাস্তি দিতে নিষেধ করা হচ্ছে। ‘হদ’ (শাব্দিক অর্থ সীমারেখা, বহুবচন হুদুদ) শব্দ দ্বারা শরিয়া আইনে নির্ধারিত শাস্তিকে যেমন বোঝানো হয়, তেমনি আল্লাহ তা’আলার নির্ধারিত আদেশ-নিষেধের সীমারেখাকেও বোঝানো হয় (হুদুদিল্লাহ)।
আলোচ্য হাদিসের উদ্যেশ্য হচ্ছে এই ২য়টি। আল কুরআনের অনেকগুলো আয়াতের সাহায্যে ফাতহুল বারীতে আলোচ্য হাদিসের এই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর দ্বারা এটা বোঝানো হয়নি যে শরিয়া নির্ধারিত কিছু অপরাধের হদ শাস্তি বাদে ১০ বেত্রাঘাতের বেশি তাযির দেয়া যাবে না। উম্মাহর অধিকাংশ উলামার ব্যাখ্যা এটিই, এটিই ছিলো সাহাবীদের বুঝ। ফাতহুল বারীতে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বিস্তারিত আলোচনায় এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে এ হাদিসের দ্বারা তাযির শাস্তির সীমা ১০ বেত্রাঘাতের বেশি দেয়া নিষিদ্ধ হয় না।

সাহাবীদের থেকে ১০ বেত্রাঘাতের বেশি তাযির শাস্তি দেবার অনেক উদাহরণ আছে। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল(র.) থেকে বর্ণিত আছে, উমার(রা.) এর আমলে হদ এর চেয়েও তাযির শাস্তি বৃদ্ধি করার ঘটনা ঘটেছিলো। তিনি একজন মদপানকারী ব্যক্তিকে ৮০ বেত্রাঘাত করেছিলেন। নবী (ﷺ) এবং আবু বকর(রা.) মদ পানকারীদেরকে ৪০ বার বেত্রাঘাত করতেন, তিনি এর সাথে ৪০ বার বেত্রাঘাত যোগ করে (তাযির) শাস্তি প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়া একজন ব্যক্তি রমযান মাসে দিনের বেলায় মদপান করেছিলো। তাঁকে আলী(রা.) এর নিকট আনা হলে তিনি তাকে নির্ধারিত শাস্তি হিসাবে [উমার(রা.) এর সুন্নাহ অনুসারে] ৮০ বেত্রাঘাত করেছিলেন এবং রমযানের রোযা ভাঙার জন্য অতিরিক্ত আরো ২০ বেত্রাঘাত করেছিলেন। [৭]

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া (র.) উল্লেখ করেছেন, “আবু বকর (রা.) ও উমার (রা.) একজন নারী ও পুরুষকে একসাথে বিছানায় পাবার পরে ১০০ বেত্রঘাত এবং পরে আবার ১০০ বেত্রাঘাত করেছেন। যে ব্যক্তি উমার(রা.) এর সীলমোহর জাল করে অবৈধভাবে বাইতুল মাল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছিলো, তাকেও তিনি [উমার(রা.)] ১০০ বেত্রাঘাত করেছিলেন। এরপর ২য় দিন তিনি তাকে ১০০ বেত্রাঘাত এবং ৩য় দিনে আরো ১০০ বেত্রাঘাত করেছিলেন।” [৮]

কাজেই কেউ যদি দাবি করে ইসলামী শরিয়া আইনে তাযির শাস্তি হল "লঘু শাস্তি" বা মাত্র ১০ বেত্রাঘাতের বেশি তা বৃদ্ধি করা যায় না - তাহলে তার দাবি সর্বৈব মিথ্যা। ইসলামি শাসক বা বিচারক অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে কঠোর তাযির শাস্তি প্রয়োগ করতে পারেন।

[১] islamqa.info/en/158282/
[২] archive.is/SvMO5
[৩] muslimbangla.com/masail/154856/ইসলামে-ধর্ষনের-শাস্তি-কি-
[৪] islamland.com/uploads/books/bn_islami_shariate_shastir_bidhan.pdf
[৫] সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৬৩৮৪
[৬] ফাতহুল বারী, ইবন হাজার আসকালানী, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৮৫
[৭] islamweb.net/en/fatwa/12066/
[৮] islamweb.net/en/fatwa/366016/

🖋️ শাইখ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলিল মাদানী হাফিজাহুল্লাহ।
শাসকের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই কি কেউ খারেজী হয়?

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের এমন সংজ্ঞা ছিল না যে, কোন হাকিমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই সে খারেজী। খুরুজের কারণ তারা স্পষ্ট উসুলে দিয়েছেন। খারেজী যাদের বলা হয় তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ‘যারা মুসলিমকে কাফির, মুশরিক তাকফীর করে থাকে। মুসলিমের রক্তপাতকে জায়েজ মনে করে। ইমামদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।

অন্যদিকে শাসকের অপকর্মের প্রতিবাদ করা আহলুল ইলমগণ পার্থক্য করেছেন। (الخروج) এবং (الإنكار) মধ্যে পার্থক্য আছে। কোন ব্যক্তি শাসকের দোষের প্রতিবাদ বা সমালোচনা করলেই সে খারেজী হয় না। শায়খ তারেফী নিজেই বিদ্রোহ করতে নিষেধ করেছেন এবং এর অর্থ এই নয় যে শাসকের ভুল ক্রুটি প্রতিবাদ করা যাবে না!

আমাদের প্রিয় শায়খ মুহাদ্দিসুল আছর মুক্ববীল ইবন হাদী আল-ওয়াদী’ঈ বলেন, أما الإنكار عليهم فلا بأس بذلك “তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাতে সমস্যা নেই”।

http://www.muqbel.net/fatwa.php?fatwa_id=4262

এখন কী শায়খ মুক্ববীলকে (রহ.) খারেজী বলা হবে? আস্তাগফিরুল্লাহ!

— মনে রাখতে হবে যে, শাসকের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করা বিদ্রোহ নয়, আর বিদ্রোহও শুধু প্রতিবাদ করার নাম নয়।

এরপরেও যারা শায়খ তারীফিকে খারেজী বলবে তারা যেন দলিল উপস্থাপন করে। হ্যাঁ; শাসকের ব্যাক্তিগত ভাবে নসিহা করার কথা আছে এবং এটিও সুন্নাহর মধ্যে শামিল হয়, কিন্তু “কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করলে খারেজী হবে” এমন দাবি করতে হলে কোরআন এবং হাদীস থেকে দলিল দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুক।

◑ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন:

উবাদা ইবনুস সামিত (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) ও অন্যান্য সাহাবী বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এই শর্তে বাই‘আত (আনুগত্যের শপথ) নিয়েছি যে, আমরা যেখানেই থাকি সত্য কথা বলব এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দাকারীর নিন্দার ভয় করব না। আমরা আল্লাহর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তারা এই বাই‘আতের শর্ত পূর্ণ করেছেন, তারা সত্য বলেছেন, সত্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন এবং আল্লাহর পথে কোনো নিন্দাকারীর নিন্দা তাদেরকে ভীত করেনি। তারা কোনো চাবুক, লাঠি, আমির বা শাসকের ভয়ে কিছুই গোপন করেননি, যেমনটি তাদের আদর্শ ও জীবনী অনুধাবনকারীরা জানেন।

আবু সাঈদ (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) মদীনার শাসক মারওয়ান-এর উপর ইনকার (অসন্তোষ ও প্রতিবাদ) জানিয়েছিলেন। উবাদা ইবনুস সামিত (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) মু‘আবিয়ার নিন্দা জানিয়েছিলেন, অথচ তিনি (মু‘আবিয়া رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) খলিফা ছিলেন। ইবনু উমার (رَضِيَ اللهُ عَنْهُ) হাজ্জাজের নিন্দা জানিয়েছিলেন, তার প্রবল ক্ষমতা ও ভয়ঙ্কর অস্তিত্ব সত্ত্বেও। আর তিনি (ইবনু উমার) আমর ইবনু সাঈদেরও নিন্দা জানিয়েছিলেন, অথচ তিনি (আমর) মদিনার আমির ছিলেন।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সাহাবী ও তাবেঈনগণ শাসক ও গভর্নরদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ করেছেন—তাদের চাবুক বা শাস্তির ভয়ে ভীত হননি।

কিন্তু তাদের পরবর্তী যুগের লোকদের মধ্যে এই মর্যাদা ছিল না, বরং তারা জুলুমকারী শাসক ও অত্যাচারী আমিরদের ভয়ে অনেক সত্য বলা থেকে বিরত থাকতেন। তাই এটি একেবারেই অসম্ভব যে, পরবর্তী যুগের লোকেরা সঠিক পথ পাবে অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ তা থেকে বঞ্চিত হবেন।

[ই’লামুল মুয়াক্বিয়িন, ৬/১৪-১৫ পৃ.]
📄 জামা‘আতুত তাবলীগ সম্পর্কে দেওবন্দি হানাফি আলেমদের বক্তব্য।
🖋️ আবু খুযাইমাহ আনসারী

জামা‘আতুত তাবলীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামা‘আহর আলেমগণ তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, তাদের কর্মপদ্ধতি এবং মানহাজের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বিভিন্ন ভুল-ত্রুটি চিহ্নিত ও স্পষ্ট করে আসছেন। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-হাদীসের আলেমগণ যখন কিতাব ও সহীহ সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতে জামা‘আতুত তাবলীগের ভুলগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, তারপরও তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়নি এবং হচ্ছে না।

এই পুরো মতবিরোধের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—আহলুস সুন্নাহ ও আহলুল হাদীস যে বিষয়গুলোতে জামা‘আতুত তাবলীগের সমালোচনা করেছেন, তাদের নিজেদের নেতৃস্থানীয় দেওবন্দি হানাফি আলেমরাও ঠিক একই বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন। যেমন:

- জামা‘আতুত তাবলীগের পদ্ধতি কুরআন, সুন্নাহ কিংবা সালাফে সালেহীনের বুঝের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
- সাধারণ মানুষের আকীদা সংশোধনের বিষয়টি তারা পরিত্যাগ করেছে।
- তাওহীদের (আল্লাহর একত্বের) মৌলিক আকীদাকে ছেড়ে দিয়ে নামাজের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং তাবলীগের কাজকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে অভিহিত করা।
- জ্ঞান ছাড়া কথা বলা; এমন সাধারণ মানুষকে বক্তৃতা ও ওয়াজ করার সুযোগ দেওয়া, যাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।
- জামা‘আতুত তাবলীগের পদ্ধতিই সংশোধনের একমাত্র পদ্ধতি এবং এটিই পূর্ণাঙ্গ—এমন বিশ্বাস রাখা।

📄 দেওবন্দি হানাফি আলেমদের বক্তব্য:

মাওলানা এহতিশামুল হাসান খান্দেলভী ছিলেন জামা‘আতুত তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াসের শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাওলানা এহতিশামুল হাসান ‘জিন্দেগী কি সিরাতে মুস্তাকীম’ (জীবনের সরল পথ) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থের শেষে তিনি ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট’ নামে একটি ছোট পুস্তিকা সংযুক্ত করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন:

“আমার জ্ঞান ও উপলব্ধি অনুযায়ী, বর্তমান নিজামুদ্দীনের (দিল্লি—তাবলীগী জামা‘আতের সদর দপ্তর) তাবলীগের পদ্ধতি কুরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি এটি হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী, হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী কিংবা সত্যপন্থী আলেমদের পদ্ধতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, যে আলেমগণ এই তাবলীগে অংশগ্রহণ করেন, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত—এই প্রচেষ্টাকে কুরআন, হাদীস, সালাফ (পূর্ববর্তী নেককার আলেমগণ) এবং সত্যপন্থী আলেমদের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।”

এর জবাবে আরেকজন দেওবন্দি হানাফি আলেম মাহমুদ হাসান গাঙ্গোহী (তিনি মাওলানা মাহমুদুল হাসান বা শাইখুল হিন্দ নন) বলেন:

“আজ পর্যন্ত আমি মনে করতাম যে, তিনি (মাওলানা এহতিশামুল হাসান) অসুস্থতার কারণে খান্দেলায় অবস্থান করছেন এবং এ কারণেই নিজামুদ্দীনে উপস্থিত হওয়া ও তাবলীগের কাজে অংশগ্রহণ ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই ‘গুরুত্বপূর্ণ নোট’ থেকে জানতে পারলাম যে, তার অংশগ্রহণ না করার কারণ হলো—তার মতে তাবলীগের এই কাজ প্রয়োজনীয় নয়; বরং এটি দ্বীনকে ধ্বংস করছে।”

(চশমাহ আফতাব, পৃষ্ঠা ৭)

‘চশমাহ আফতাব’-এর লেখক ক্বমরুদ্দীন মাযাহিরী তার ভূমিকায় লিখেছেন:

“মাওলানা এহতিশামুল হাসান এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অতি সম্প্রতি তিনি জামা‘আতুত তাবলীগকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন যে, এটি এমন একটি দল, যারা মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করে।”

(চশমাহ আফতাব, পৃষ্ঠা ৩)

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়্যাহ বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং একই সঙ্গে তাবলীগীদের ও দেওবন্দীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:

“তবে আমিও শুনছি যে, মাওলানা থানভীর কিছু খলিফা ও বিশেষ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ জামা‘আতুত তাবলীগকে পছন্দ করেন না।”

(চশমাহ আফতাব, পৃষ্ঠা ১১)

খলীল আহমাদ সাহারানপুরীর প্রতিনিধি (খলিফা) এবং জামা‘আতুত তাবলীগের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ ইলিয়াস ও তার ছেলে মাওলানা ইউসুফের ঘনিষ্ঠ কর্মী দেওবন্দি আলেম আবদুর রহীম শাহ বলেন:

“যে কাজটি জ্ঞানীদের জন্য নির্ধারিত, সাধারণ মানুষ সেটিই করতে চায়। অথচ তারা শুধু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞই নয়; বরং তাদের অজ্ঞতা ও অসৎকর্মের কারণে সমাজে তাদের ভালোভাবেও দেখা হয় না। এরপর এই কথাটি বিবেচনা করুন: ‘যখন কোনো জাতির নেতা খারাপ হয়ে যায়, তখন সে তার জাতিকে কেবল ধ্বংসের পথই শিক্ষা দেয়।’”

(উসূলু দা‘ওয়াতি ওয়াত-তাবলীগ, পৃষ্ঠা ৩)

তিনি আরও বলেন:

“আমি (আবদুর রহীম) আল্লাহর কসম করে বলছি যে, আমি যে তাবলীগ করছি, তা কেবল প্রয়োজনের কারণে করছি। ফলে মানুষের কাছে আমি ওজরগ্রস্ত। কারণ, এই যুবকেরা যখন থেকে প্রকাশ্যে ওয়াজ শুরু করেছে—যার জন্য শরীয়ত অনুযায়ী তাদের কোনো অনুমতি নেই—এবং তাবলীগের ফযীলত ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেছে, তখন তারা দ্বীনের অন্যান্য দিকগুলো প্রকাশ্যে গোপন করেছে। ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও যখন তাদের থামানো হয়নি, তখন এসব পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উচিত বিষয়টি প্রকাশ্যে ও সর্বসমক্ষে
❤3
তুলে ধরা।”

(উসূলু দা‘ওয়াতি ওয়াত-তাবলীগ, পৃষ্ঠা ৫২)

মাওলানা আবদুর রহীম শাহ লিখেছেন:

“বিদ‘আতকে (সুন্নাহ-বহির্ভূত বিষয়কে) সুন্নাহ মনে করা আকীদাগত দিক থেকে একটি নিন্দনীয় কাজ। মানুষের কিছু আমল সংশোধন করা অথচ তাদের আকীদার ত্রুটিগুলোর প্রতি চোখ বন্ধ করে রাখা কীভাবে সঠিক হতে পারে—তা আমি বুঝতে পারি না। কারণ সঠিক আকীদাই মুক্তির মাধ্যম; আমল নয়।”

(উসূলু দা‘ওয়াতি ওয়াত-তাবলীগ, পৃষ্ঠা ৬৪)

প্রসিদ্ধ দেওবন্দি আলেম মানযূর আহমাদ নু‘মানী জামা‘আতুত তাবলীগের বিরুদ্ধে একটি আপত্তি উত্থাপন করে বলেন:

“এই ভুলটি বেশ ব্যাপক যে, সাধারণ সমাবেশগুলোতে এমন লোকদের বক্তৃতা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যারা এর উপযুক্ত নয়। কখনো কখনো এই লোকেরা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কেও পূর্ণ জ্ঞান রাখে না। ফলে কথা বলার সময় তারা তাদের জ্ঞানের সীমাও উপলব্ধি করে না। এ ব্যাপারে এটাই বাস্তবতা এবং এই ভুলগুলো প্রায়ই ঘটে থাকে। অতএব, ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের এ বিষয়ে চিন্তা ও পর্যালোচনা করা উচিত।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৪৪)

আবুল হাসান আলী নদভী বলেন:

“মাওলানার (আশরাফ আলী থানভী) একটি অসন্তোষের বিষয় ছিল—জ্ঞান ছাড়া এসব মানুষ (অর্থাৎ জামা‘আতুত তাবলীগ) কীভাবে মানুষকে তাবলীগের গুরুত্বের দিকে আহ্বান করবে? অতঃপর যখন (মাওলানার ভাগ্নে) যাফর আহমাদ থানভী তাকে জানালেন যে, যেসব বক্তা এসব বক্তব্য দেন, তারা কেবল তাদেরকে যে বিষয়গুলোতে কথা বলতে বলা হয়েছে সেসব বিষয়েই কথা বলেন এবং এর বাইরে কিছু বলেন না, তখন তিনি (মাওলানা আশরাফ আলী) সন্তুষ্ট হলেন।”

(দীনী দা‘ওয়াত, পৃষ্ঠা ১২৬)

মাওলানা যাফর আহমাদ থানভীর জীবনীকার মাওলানা আবদুশ শাকুর তিরমিযী বলেন:

“আমরা আরও ব্যাপকভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, যারা তাবলীগের উদ্দেশ্যে সফর করেন, তাদের জ্ঞান নেই। এর ফলে বক্তারা বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলেন এবং এর সঙ্গে গল্প ও লোককাহিনি উল্লেখ করেন। আর এভাবে তাদের অধিকাংশই তাদের জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করেন।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৪২)

মাওলানা যাফর আহমাদ থানভী নিজেই বলেন:

“মানুষকে ইসলামের জ্ঞান এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞানের ওপর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জামা‘আতুত তাবলীগের বর্তমান পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৫২)

তিনি আরও বলেন:

“ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তির তাবলীগ নির্ভরযোগ্য নয়।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৫৩)

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, মাওলানা যাফর আহমাদ থানভী এমন একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলেছেন, যিনি জামা‘আতুত তাবলীগের পদ্ধতি অনুসারে তাবলীগ করেন এবং তাকে ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আবদুশ শাকুর তিরমিযী লিখেছেন:

“মাওলানা (যাফর আহমাদ) কখনোই জামা‘আতুত তাবলীগে যোগদান করা এবং তাদের সঙ্গে কাজ করাকে যথেষ্ট মনে করতেন না।”

(তাযকিরাতুয যাফর, পৃষ্ঠা ২৪১)

দারুল উলূম দেওবন্দের আরেকজন শিক্ষক বলেন:

“আমি যখন তাদের (অর্থাৎ জামা‘আতুত তাবলীগের) তাবলীগের পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তখন থেকেই আমি কখনোই এতে সন্তুষ্ট ছিলাম না।”

(তানবীহাত, পৃষ্ঠা ১২)
❤1
📄 সাহাবায়ে কেরামের মাওকূফ বর্ণনাসমূহের ব্যাপারে হানাফীদের অবস্থান।
🖋️ আবু হিব্বান ও আবু খুযাইমাহ আনসারী।

আ‘ঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র জগতের রব। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর সম্মানিত শেষ নবী, তাঁর সম্মানিত পরিবার, তাঁর মর্যাদাবান সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত উত্তমভাবে তাঁদের অনুসরণকারীদের ওপর....

সমস্ত অস্তিত্বের রবের জন্যই সকল প্রশংসা এবং তাঁরই উদ্দেশ্যে সকল প্রশংসা নিবেদিত।

তাঁর প্রিয় ও শেষ রাসূলের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক, তাঁর সম্মানিত পরিবার ও মর্যাদাবান সাহাবীগণের ওপর এবং তাঁদের ওপরও, যারা উত্তমভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে শেষ সময় পর্যন্ত।

◑ ভূমিকা

এটি একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ। এতে হানাফীদের—বিশেষত দেওবন্দী ও বেরেলভীদের—মূলনীতি এবং নবী ﷺ-এর ঐশী হাদীসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হবে। এই প্রবন্ধে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আলোচনা ও পর্যালোচনা করার উদ্দেশ্য রয়েছে:

- সাহাবায়ে কেরামের মাওকূফ বর্ণনার ব্যাপারে হানাফীদের অবস্থান।
- সাহাবায়ে কেরামের প্রতি হানাফীদের আক্রমণ।
- বুখারী ও মুসলিমের রাবীদের প্রতি হানাফীদের তীব্র আক্রমণ। কেন এবং কী উদ্দেশ্যে?
- হানাফী ও নবী ﷺ।
- বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাগুলোর সমালোচনা কে করেছেন—ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী رحمه الله, নাকি হানাফীরা? এবং কেন?

কোনোভাবেই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য আকীদাহ বা ফিকহের এমন বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা নয়, যেখানে হানাফীরা—অর্থাৎ দেওবন্দী ও বেরেলভীরা—তাদের দলাদলি ও মাযহাবের অন্ধ অনুসরণের কারণে হাদীস প্রত্যাখ্যান করেছে।

এ প্রবন্ধে হানাফী-দেওবন্দীদের তথাকথিত ‘ফিকহ’-এর অসংগতিগুলোও আলোচনা করা হবে না। কারণ তাদের ‘ফিকহ’ মূলত বিচ্ছিন্ন মতামত ও ফতোয়ার এমন এক বিশৃঙ্খল সমষ্টি, যা শুধু ঐশী দলীলের বিরোধিতা করে না; বরং সালাফে সালেহীন ও তাঁদের ফতোয়ারও বিরোধিতা করে। যারা সময় ও ধৈর্য নিয়ে হানাফী গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে দলীলগুলো একত্র করতে পারবেন, তারা বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

অতঃপর— শত শত বছর ধরে পথভ্রষ্ট লোকেরা আহলুল হাদীসের প্রতি বিভিন্ন অপবাদ ও গালিগালাজ করে আসছে। হানাফীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষত দেওবন্দী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয় যে, আহলুল হাদীস এমন একটি দল, যারা সাহাবায়ে কেরামের رضي الله عنهم أجمعين বক্তব্য ও হাদীস গ্রহণ করে না এবং এর মাধ্যমে তারা শিয়াদের ও পথভ্রষ্টদের সাদৃশ্য গ্রহণ করেছে।

যদি হানাফীরা এ কথা বোঝাত যে, কোনো সাহাবীর বক্তব্য যদি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত মারফূ‘ হাদীসের বিরোধী হয়, তাহলে সেই সাহাবীর বক্তব্যকে মারফূ‘ হাদীসের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না—তাহলে তাদের এ বক্তব্য সঠিক হতো এবং আহলুল হাদীসের অবস্থানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। কারণ আহলুল হাদীস রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র হাদীসের বিরোধিতা করে কোনো ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ বা তার মতামত আঁকড়ে ধরা অনুমোদন করেন না।

কিন্তু হানাফীরা তাদের চিরাচরিত দ্বিমুখী পদ্ধতিতে ইঙ্গিত করেছে যে, আহলুল হাদীসের এই অবস্থান শুধু ভুলই নয়; বরং এটি সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের হাদীসের ওপর আক্রমণ।

মজার বিষয় হলো, হাদীস প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে দেওবন্দীরাই অগ্রগণ্য। প্রকৃতপক্ষে হানাফী মাযহাবের কাছে সুন্নাহ ও হাদীসকে কিয়াস ও ব্যক্তিগত মতামতের সমপর্যায়ের একটি গৌণ উৎস হিসেবে দেখা হয়। বরং বহু ক্ষেত্রে পরবর্তী মতামতকে বরকতময় হাদীসের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—ইনশাআল্লাহ পরবর্তী অংশে এর উদাহরণ তুলে ধরা হবে।

হাদীসের ক্ষেত্রে প্রচুর প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হানাফী-দেওবন্দীরা শুধু মাওকূফ রেওয়ায়াত—অর্থাৎ যেসব বর্ণনা সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে কিন্তু নবী ﷺ পর্যন্ত পৌঁছেনি—প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং তারা আরও অগ্রসর হয়ে কিছু সাহাবীর সমালোচনা করেছে এবং সাহাবীদের ‘আদালাহ’ (عدالة) ও ‘দব্‌ত’ (ضبط)—অর্থাৎ তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা, নির্ভরযোগ্যতা, জ্ঞান সংরক্ষণ ও নির্ভুলতার ওপরও আক্রমণ করেছে। এর কারণ হলো, এসব সাহাবীর বর্ণনা হানাফী মাযহাব অথবা হানাফী কিয়াসের বিরোধী ছিল।

সুতরাং প্রকৃতপক্ষে শিয়াদের সঙ্গে সাদৃশ্য তারাই গ্রহণ করেছে—আহলুল হাদীস নয়। এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য হলো তা প্রমাণ করা।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, এই প্রবন্ধে হানাফী ও সাহাবীদের বিষয় দিয়ে শুরু করা হলো কেন?

এর উত্তর হলো—দেওবন্দীরাই এমন সম্প্রদায়, যারা সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়ে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয় যে তারা সাহাবায়ে কেরামের রক্ষক এবং তাঁদের প্রতি তাদের সর্বাধিক ভালোবাসা রয়েছে। অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

যাই হোক, সাহাবায়ে কেরামকে দিয়ে শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের আকীদাহর একটি মূলনীতি হলো—আমাদের দ্বীনের সম্পূর্ণ বুঝ সাহাবায়ে কেরামের বুঝের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা সরাসরি নবী ﷺ-এর কাছ থেকে দ্বীন শিখেছিলেন এবং এ কারণে তাঁরা নবী ﷺ-এর উম্মতের কাছে সত্য ও ওহী পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিলেন।
সহজ ভাষায় বললে, কেউ যদি সাহাবায়ে কেরামের ওপর আক্রমণ করে—যেমনটি দেওবন্দীরা করে—তাহলে সেই আক্রমণ ইসলামের ভিত্তি ও ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার ওপরই আক্রমণ।

সাহাবায়ে কেরামের মাওকূফ বর্ণনার ব্যাপারে হানাফীদের অবস্থান

‘ধোঁকা দেওয়ার’ প্রক্রিয়ার সূচনা

হানাফীরা আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে, আমরা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অসম্মান করি। কারণ, কোনো সাহাবীর মাওকূফ রেওয়ায়াত যদি মারফূ‘ রেওয়ায়াতের বিরোধী হয়, তাহলে আমরা সেই মাওকূফ রেওয়ায়াতকে মারফূ‘ রেওয়ায়াতের ওপর অগ্রাধিকার দিই না।

এখানে লক্ষণীয় যে, দেওবন্দরাও নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একই ধরনের মত পোষণ করে।

নিচে দেওবন্দীদের এমন কিছু বক্তব্যের উদাহরণ দেওয়া হলো, যা তারা মানুষের সামনে পেশ করে। এসব বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে, তারা বলতে চাচ্ছে—নবী ﷺ-এর হাদীস ও আমলের বিরোধী হলে কোনো সাহাবী পর্যন্ত অনুসরণযোগ্য নন।

অবশ্য তাদের এ বক্তব্য বাস্তবে অর্থহীন। কারণ প্রকৃত বাস্তবতা হলো—এটি তাদের ইমাম আবু হানীফা رحمه الله (মৃ. ১৫০ হিজরী)-এর অবস্থান রক্ষা করার জন্য সাহাবীদের গ্রহণযোগ্যতাকে আক্রমণ করা, তাঁদের প্রত্যাখ্যান করা, তাঁদের গালি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সবকিছু করার একটি কুটিল পরিকল্পনা। সাহাবায়ে কেরাম কিংবা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বর্ণনা যা-ই হোক না কেন, আবু হানীফার মত রক্ষাই তাদের উদ্দেশ্য।

এটাই দেওবন্দী সম্প্রদায় ও সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে তাদের প্রকৃত বাস্তবতা ও অবস্থান—যার উদাহরণ সামনে আসছে।

প্রথমে দেওবন্দীদের কথিত ‘সরকারি’ আকীদাগত অবস্থানের কিছু উদাহরণ দেখা যাক। এগুলো এমন যে, কেউ না জানলে মনে করতে পারে এগুলো আহলুল হাদীস আলেমদের লেখা; অথচ এগুলো দেওবন্দীদেরই বক্তব্য।

সরফরাজ খান সফদর দেওবন্দী হায়াতী (মৃ. ১৪৩০ হিজরী)

তিনি তাঁর রাহে সুন্নত [راه سنت] গ্রন্থের ১১৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশেষ করে এই ক্ষেত্রে সাহাবীর—অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ رضي الله عنه-এর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু আমরা যখন উলূমুল হাদীসের দিকে তাকাই, তখন মারফূ‘—অর্থাৎ নবী ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত—বর্ণনা এবং মাওকূফ বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য উপেক্ষা করা যায় না। যেসব বর্ণনা মারফূ‘, সেগুলোর যে মর্যাদা প্রাপ্য, শুধু সাহাবী পর্যন্ত পৌঁছানো মাওকূফ রেওয়ায়াতকে—যদিও তা সহীহ হয়—সেই মর্যাদা দেওয়া যায় না।”»

মন্তব্য: তাহলে কি দেওবন্দীরা ঐশী নস তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দলীল উপস্থিত থাকলে সাহাবীদের তাকলীদ না করার পক্ষে? যদি তাই হয়, তাহলে কি তারা আবু হানীফা رحمه الله অথবা তাঁর চেয়েও মর্যাদায় নিম্ন অন্য কোনো ব্যক্তির তাকলীদও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঐশী দলীলের উপস্থিতিতে না করার পক্ষে?

যদি না হয়, তাহলে কেন নয়?

আবু হানীফা رحمه الله কি সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে বড় মুজতাহিদ, ফকীহ বা ইমাম ছিলেন? অথবা আবু হানীফা رحمه الله কি সাহাবীদের চেয়ে অধিক বিশ্বস্ত ছিলেন? কিংবা আবু হানীফার رحمه الله দব্‌ত ও ‘আদালাহ কি সাহাবীদের চেয়ে বেশি ছিল?

যেহেতু ‘সহীহ’ মাওকূফ রেওয়ায়াতগুলো মারফূ‘ হাদীসের মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে না, তাহলে ইমাম আবু হানীফা رحمه الله-এর বক্তব্য এবং হানাফী মাযহাবের বক্তব্যের মর্যাদা কী—যার অধিকাংশ, যদি পুরোপুরি না-ও হয়, আবু হানীফা رحمه الله পর্যন্ত পৌঁছানো কোনো ‘সহীহ’ সনদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং অধিকাংশ সনদ বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল, এবং তার সঙ্গে রয়েছে দুর্বল কিয়াস ও এমন সব মানুষের মতামত, যারা একজন সাহাবীর তুলনায়ও অনেক নিম্ন মর্যাদার?

সাহাবায়ে কেরাম ও নবী ﷺ-এর বক্তব্য উপস্থিত থাকা অবস্থায় কেউ কি অন্ধভাবে হানাফী মাযহাব আঁকড়ে ধরতে পারে? এর ইসলামী বিধান কী?

দেওবন্দীদের শায়খুল হাদীস ও শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী (মৃ. ১৩৩৯ হিজরী)

তিনি তাঁর তাকারীর শায়খুল হিন্দ (تقارير شيخ الهند) গ্রন্থের ৩০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“সাহাবীর আমলের ক্ষেত্রে তা আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয় (অর্থাৎ তা আমাদের জন্য হুজ্জাহ নয়)।”»

শায়খ মাহমুদুল হাসান তাকারীর শায়খুল হিন্দ, পৃষ্ঠা ৪৩-এ একটি বিষয় সম্পর্কে বলেন:

«“এটি মূলত একজন সাহাবীর বক্তব্য। অতএব হানাফীদের বিরুদ্ধে এটিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।”»

দারুল উলূম দেওবন্দের পিতা ও শায়খুল হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (মৃ. ১৩২৫ হিজরী)

তিনি তাঁর বায়ান-ই-মুকাদ্দিমাহ মারযাআই আল-বাহাওয়ালপুরী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৫-এ লিখেছেন:

«“সাহাবীর বক্তব্য আমাদের কাছে সেইভাবে দলীল নয়, যেভাবে নবী ﷺ-এর বক্তব্য দলীল।”»

দেওবন্দী আলেম ও তাঁদের ইমাম খলীল আহমদ সাহারানপুরী (মৃ. ১৩৪৬ হিজরী)

তিনি আবু দাউদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ বাযলুল মাজহূদ [بذل المجهود], ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯-এ একটি বিষয়ে বলেন:

«وهو مذهب الصحابي لا يقوم بحجة على أحد»

“এটি মূলত একজন সাহাবীর মাযহাব, যা কারও ওপর বাধ্যতামূলক নয়।”
মন্তব্য: যদি একজন সাহাবীর মাযহাব কারও ওপর বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে আবু হানীফা رحمه الله-এর মাযহাব কীভাবে কারও ওপর বাধ্যতামূলক হতে পারে?

তিনি একই গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ৩৮ পৃষ্ঠায় অন্যত্র লিখেছেন:

«“এটি মূলত আবু হুরাইরাহ رضي الله عنه-এর বক্তব্য। অতএব এটি অনুসরণ করার মতো দলীল নয়।”»

হানাফী-বেরেলভী ও দেওবন্দীদের ইমাম মোল্লা আলী আল-কারী (মৃ. ১০১৪ হিজরী)

তিনি তাঁর আল-মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ [مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح], ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৯-এ লিখেছেন:

«“এটি একজন সাহাবীর মাযহাব, যা আমাদের ওপর হুজ্জাহ নয়।”»

আধুনিক যুগের দেওবন্দী ফিকহের ইমাম জাফর আহমদ উসমানী থানভী (মৃ. ১৩৯৪ হিজরী)

তিনি তাঁর ফিকহের বিশ্বকোষ ই‘লাউস সুনান, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৮-এ লিখেছেন:

«“মারফূ‘ হাদীসের তুলনায় সাহাবীর বক্তব্য হুজ্জাহ নয়।”»

মন্তব্য: উপরের বক্তব্যগুলোর পাশাপাশি আরও প্রশ্ন রয়েছে—‘হুজ্জাহ’ তথা অনুসরণযোগ্য দলীল বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? হানাফী মাযহাবে কে তা নির্ধারণ করে?

আবু হানীফা رحمه الله-এর প্রতিটি বক্তব্যকে তাঁর অন্ধ অনুসারীদের জন্য ‘হুজ্জাহ’ হিসেবে কে নির্ধারণ করেছে?

তাঁর সেই একনিষ্ঠ মুকাল্লিদরাই তো তা নির্ধারণ করেছে, যারা মূলত অজ্ঞতার কারণে অন্ধভাবে অনুসরণ করছিল।

এ অবস্থায় এমন একদল মানুষের মতামতের আইনগত মূল্য কী, যারা নিজেরাই ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে কোনো গ্রহণযোগ্য মতামত দেওয়ার যোগ্য নয়?

আধুনিক যুগের দেওবন্দী ইমাম ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি তাকী উসমানী

তিনি তাঁর দরসে তিরমিযী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৯-এ আবু হুরাইরাহ رضي الله عنه-এর একটি রেওয়ায়াত সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি ফজরের সালাতে কুনূত পড়তেন। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাকী উসমানী বলেন:

«“এই রেওয়ায়াতটি মাওকূফ এবং এটি আমাদের জন্য দলীল নয়।”»

তাকী উসমানী দরসে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৯-এ আরও বলেন যে, হানাফীরা এর জবাব এভাবে দিয়েছে:

«“এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্তব্য থেকে প্রমাণিত নয়। আর যা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত নয়, সেখানে সাহাবীর বক্তব্য বা আমল গ্রহণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।”»

মন্তব্য: সংক্ষেপে, দেওবন্দীর বক্তব্য হলো—সব বিষয়ে অনুসরণের মানদণ্ড স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবী নন।

তিনি এই দাবিতে কতটা সত্যবাদী, তা নিচে দেখা যাবে।

তিনি দরসে তিরমিযী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১-এ আরও বলেন:

«“অতএব এর জবাব হবে—এটি ইবনু উমর رضي الله عنه-এর আমল ও ইজতিহাদ। এ বিষয়ে কোনো মারফূ‘ হাদীস বর্ণিত হয়নি। উপরন্তু, সাহাবীর ইজতিহাদ হুজ্জাহ নয়, বিশেষত যখন অন্যান্য সাহাবী থেকে এর বিরোধী রেওয়ায়াতও রয়েছে।”»

বর্তমান যুগের দেওবন্দী মুফতী জামিল আহমদ নজীরী

তিনি তাঁর রাসূলুল্লাহ ﷺ কা তরীকায়ে নামায গ্রন্থের ২৫৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“স্বীকার করা হয় যে, কিছু সাহাবী এক বিতর পড়তেন এবং এ বিষয়ে রেওয়ায়াতও পাওয়া যায়। কিন্তু এটি ছিল তাঁদের নিজস্ব ইজতিহাদ। আর নবী ﷺ থেকে বর্ণিত বহু মারফূ‘ রেওয়ায়াতের বিরোধী হওয়ার কারণে এ ধরনের ইজতিহাদকে হুজ্জাহ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।”»

মন্তব্য: তাহলে দেওবন্দীরা কেন এত ভণ্ডামি করে আহলুল হাদীসের ওপর তীব্র আক্রমণ করে—যখন আহলুল হাদীস বলে যে, নবী ﷺ-এর বিরোধী হলে কোনো ব্যক্তির বক্তব্য—এমনকি কোনো সাহাবীর বক্তব্যও—গ্রহণ করা যাবে না?

তারা কি আবু হানীফা رحمه الله-এর ইজতিহাদের ক্ষেত্রেও সাহাবীদের ক্ষেত্রে যে একই বিধান প্রয়োগ করে, তা প্রয়োগ করে?

যদি করে থাকে, তাহলে শুধু আবু হানীফা رحمه الله-এর ইজতিহাদ নয়, তাঁর পুরো মাযহাবের ক্ষেত্রেও কেন একই নীতি প্রয়োগ করে না?

সরফরাজ খান সফদর

তিনি তাঁর আহসানুল কালাম ফি তারকিল কিরাআতি খালফ [أحسن الكلام في ترك القراءة خلف], ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪২-এ লিখেছেন:

«“ইমামের পেছনে ফাতিহা পাঠের ব্যাপারে উবাদাহ ইবনুস সামিত رضي الله عنه-এর হাদীসটি তিনি সঠিকভাবে বুঝেছিলেন কি না, তা যাই হোক—এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, উবাদাহ رضي الله عنه ইমামের পেছনে ফাতিহা পড়তেন। এটি ছিল তাঁর অবস্থান এবং তাঁর গবেষণা তাঁকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। এটিই ছিল তাঁর মাযহাব। কিন্তু কোনো সাহাবীর বুঝ এবং সাহাবী থেকে বর্ণিত মাওকূফ রেওয়ায়াত আমাদের জন্য হুজ্জাহ নয়, বিশেষত যখন তা কুরআন, সহীহ হাদীস এবং অধিকাংশ সাহাবীর বিরোধী হয়।”»

অন্যত্র সরফরাজ খান সফদর তাঁর খাযায়িনুস সুনান [خزائن السنن], যা জামি‘ আত-তিরমিযীর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৪-এ লিখেছেন:

«“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আয়িশাহ رضي الله عنها মৃতদের শোনার সক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কালিমায়ে শাহাদাত পড়েছি এবং তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, মৃতরা শুনতে পারে। তাহলে এখন আমরা কাকে অনুসরণ করব—নবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে, নাকি সাহাবী আয়িশাহকে?”»

মন্তব্য: আপনি কি আবু হানীফা رحمه الله ও তাঁর মাযহাবের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করেন, নাকি তাঁরও কালিমা পড়েছেন?
আপনি কি একমত যে, কেউ যদি নবী ﷺ-এর বিরোধিতা করে অন্য কারও বক্তব্য গ্রহণ করে, তাহলে এটি নবী ﷺ ছাড়া অন্য কারও কালিমা পাঠ করার সমতুল্য?

যে ব্যক্তি এমন কাজ করে, তার ব্যাপারে ইসলামী বিধান কী?

হায়! যদি একনিষ্ঠ হানাফী-দেওবন্দী ও বেরেলভীরা সাহাবায়ে কেরাম رضي الله عنهم أجمعين এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষেত্রে একই সৌজন্য দেখাত—যখন তাদের মাযহাব কোনো সহীহ হাদীস অথবা সাহাবীদের কোনো হাদীসের বিরোধিতা করে, তখন তারা যেন নিজেদের মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ অব্যাহত না রাখত।

আশরাফ আলী থানভী (মৃ. ১৩৬২ হিজরী)-এর খলীফা আবদুল মাজীদ দারিয়াবাদী দেওবন্দী (মৃ. ১৩৯৭ হিজরী)

তিনি তাঁর হাকীমুল উম্মত গ্রন্থের ২৭৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

«“সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের ইজতিহাদের ক্ষেত্রে ভুল থেকে মুক্ত ছিলেন না। যদিও এটি স্বীকৃত যে, অন্যান্য নেককার আলেমগণ মর্যাদার দিক থেকে সাহাবীদের চেয়ে নিম্নস্তরের।”»

উপরের বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, হানাফী-দেওবন্দীরা নিজেরাই এবং তাদের পূর্ববর্তী আলেমরা বলেছেন—কোনো সাহাবীর বক্তব্য যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মারফূ‘ হাদীসের বিরোধী হয়, তাহলে তা পরিত্যাগ করতে হবে।

কিন্তু আহলুল হাদীস অতীত ও বর্তমানকালে যখন একই কথা বলেছে, তখন তারা মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এই বলে যে, আহলুল হাদীস সাহাবীদের বিরোধী এবং সাহাবীদের অনুসরণ না করার কারণে তারা ক্ষুদ্র বা নিম্নস্তরের শিয়াদের মতো।

অথচ সবাই জানে যে, আহলুল হাদীসই কুরআন ও সুন্নাহকে সাহাবায়ে কেরামের বুঝ অনুযায়ী এবং এই উম্মতের সালাফে সালেহীনের পদ্ধতিতে বোঝার প্রচার করে। তাঁরা কারও অন্ধ তাকলীদ করেন না।

অন্যদিকে দেওবন্দী ও বেরেলভীরা স্পষ্টভাবেই নিজেদের ইমামদের বক্তব্য আঁকড়ে ধরেছে—শুধু সাহাবায়ে কেরামের বিরোধিতা করেই নয়, বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের বিরোধিতা করেও।
📄 সাহাবায়ে কেরামকে আক্রমণ এবং হানাফিদের অবস্থান।
🖋️ আবু হিব্বান ও আবু খুযাইমাহ আনসারী।

দেওবন্দীদের সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁদের বর্ণিত রিওয়ায়াতসমূহের প্রতি অবস্থানের ‘বাস্তবতা’—যার মধ্যে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি তাঁদের কটূক্তি ও আক্রমণও অন্তর্ভুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে আমরা বলি, সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে মন্দ কথা বলার ক্ষেত্রে হানাফি-দেওবন্দীরা অগ্রভাগে রয়েছে। ফলে তারা শুধু শিয়াদের সঙ্গে সাদৃশ্যই রাখে না; বরং কার্যত শিয়াদের জন্য সহায়কও হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এসব করেছে তাদের মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য; কারণ কোনো সাহাবির রিওয়ায়াত তাদের মাযহাবের মতের বিরোধী হয়ে যেতে পারে।

দেওবন্দী মাহমুদুল হাসান তাঁর তাকরীরাতুশ শাইখিল হিন্দ গ্রন্থের ১৩৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) সম্পর্কে হানাফিরা বলে থাকে:

«“তিনি এমন একজন নারী ছিলেন, যিনি তর্কপ্রবণ এবং কথাবার্তায় লাগামহীন ছিলেন।”»

হানাফিদের উসূলের গ্রন্থ নূরুল আনওয়ার, পৃষ্ঠা ১৮৩ এবং উসূলুশ শাশী, পৃষ্ঠা ৮৫-তে বলা হয়েছে:

«“আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ ছিলেন না। আর তাঁর রিওয়ায়াত যদি কিয়াসের বিরোধী হয়, তাহলে তা পরিত্যাগ করা হবে।”»

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর প্রতি হানাফিরা এই কটূক্তি করেছে তাঁর বর্ণিত মুসাররাহর হাদিসের কারণে। এই হাদিসটি মুত্তাফাকুন আলাইহি। এর সারকথা হলো—কোনো ব্যক্তি যখন কোনো পশু বিক্রি করবে, তখন তার দুধ দোহন না করে এমনভাবে রাখা উচিত নয়, যাতে ক্রেতার কাছে মনে হয় যে পশুটির ওলান প্রকৃতপক্ষে যতটুকু দুধ উৎপাদন করে তার চেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন করে। যদি এমনটি করা হয় এবং ক্রেতা পশুটির দুধ দোহন করে ফেলে, তাহলে তার পশুটি ফেরত দেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং এর সঙ্গে এক সা‘ পরিমাণ খেজুর ফেরত দিতে হবে; অথবা সে পশুটি নিজের কাছে রাখতে পারে।

এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হানাফিরা আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই বক্তব্যের পেছনের যুক্তি বা কিয়াস বুঝতে পারেনি—যে পশু ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি বিক্রেতাকে এক সা‘ খেজুরও দিতে হবে। ফলে তাঁর সহিহ হাদিসটি প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের একটি পথ খুঁজে বের করতে হয়েছে। আর তা করার একমাত্র উপায় ছিল হাদিসের ইমাম ও সাহাবি আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যক্তি ও মর্যাদাকে আক্রমণ করা, যাতে তাদের মাযহাবের অবস্থান রক্ষা করা যায়।

তারা ভুলে যায় যে, ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-ও আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মতো একই ফতোয়া দিয়েছিলেন। উপরে বর্ণিত তাদের এই প্রতারণার বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা কি প্রশ্ন করার সাহস করতে পারি না যে, যদি আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ না হন এবং তিনি যদি সুস্পষ্ট যুক্তি ও কিয়াসের বিরোধী কথা বলতেন, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) অথবা অন্য কেউ কীভাবে ফকিহ হতে পারেন?

এই কারণেই হানাফি মাযহাব ও ফিকহের গ্রন্থসমূহে এসব নীতিমালা আজও একের পর এক সংস্করণে পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে এবং হানাফি মাযহাবের শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে এগুলো পড়ানো হচ্ছে। শত শত বছর আগে করা এসব বক্তব্য থেকে কোনো কিছু বাদ দেওয়া হয়নি এবং কোনো প্রত্যাহারও করা হয়নি।

আমাদের শাইখ, হাফিজ সানাউল্লাহ যাহিদী ইবনু ইমামুদ্দীন (হাফিযাহুল্লাহ), নূরুল আনওয়ার-এর সমালোচনা ও পর্যালোচনায় গ্রন্থটির ওপর বিস্তারিত টীকা লিখেছেন। ৩য় খণ্ডের ২৪৫-২৪৬ পৃষ্ঠায় তিনি প্রায় আঠারোজন হানাফি ইমাম ও ফকিহের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, যারা সাহাবি আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ ছিলেন না—এই মত পোষণ করতেন। ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

এছাড়াও আমাদের শাইখ যুবাইর আলী যাঈ (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ১৪৩৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, তাঁর রচনাসমূহ দেখা যেতে পারে। তিনি এক জায়গায় অন্তত একচল্লিশটি সাহাবির বক্তব্য সংকলন করেছেন, যেখানে দেওবন্দীরা নিজেদের মাযহাব—অর্থাৎ ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য স্পষ্টভাবে সাহাবিদের বিরোধিতা করেছে। আমরা আশা করি, এই প্রবন্ধের পরবর্তী কোনো অংশে আমরা এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করব।

আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর পাশাপাশি অন্যান্য সাহাবিকেও সমালোচনা

হানাফিরা শুধু আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সমালোচনায় থেমে থাকেনি; বরং অন্যান্য সাহাবিকেও সমালোচনা করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, নামাজের কাতারে পা-এর সঙ্গে পা এবং গোড়ালির সঙ্গে গোড়ালি মিলিয়ে দাঁড়ানোর রিওয়ায়াতটি আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন। এ বিষয়ে আমীন সাফদার ওকরভী দেওবন্দী (মৃত্যু ১৪২১ হিজরি) তাঁর হাশিয়াহ তাফহীমুল বুখারি আলা সহিহিল বুখারি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮০-তে লিখেছেন:

«“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময়ে আনাস এমন একজন বালক ছিলেন, যে বালেগ হয়নি এবং তিনি পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন।”»

আমীন ওকরভী আরও লিখেছেন:
«“আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং তিনি যা করেছিলেন, তা তাঁর শিশুকালের কাজ ছিল। তিনি অন্য শিশুদের সঙ্গে শুধু তা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু যখন তিনি বড় হলেন, তখন অন্যান্য সাহাবি ও তাবিয়িরা তাঁর শৈশবকালের সেই কাজের কারণে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।”»

মন্তব্য: এখানে আমরা আবারও দেখতে পাচ্ছি—সহিহ বুখারিতে কোনো সাহাবির মাধ্যমে বর্ণিত এমন একটি রিওয়ায়াত, যার বিরুদ্ধে অন্য কোনো সাহাবি আপত্তি করেননি, সেটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং রাবিকে ‘শিশু’ বলে হেয় করা হচ্ছে, যেন তাঁর বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা যায়।

অথচ এই রিওয়ায়াত এবং এর অনুরূপ রিওয়ায়াত আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছাড়া অন্য সাহাবিরাও বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে সাহাবি আবু আবদুল্লাহ নু‘মান ইবনু বশীর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-ও রয়েছেন, যা সহিহ বুখারিতে রয়েছে।

অতএব আবারও সাহাবায়ে কেরামের দবত (সংরক্ষণশক্তি ও নির্ভুলতা) এবং আদালত (বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতা)-এর ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে, কারণ তাঁদের অবস্থান ‘কথিতভাবে’ আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবের বিরোধী।

এই প্রতারণার পর্দা ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে।

রফউল ইয়াদাইন এবং ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)

সহিহ বুখারিতে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) কর্তৃক বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত উত্তোলন—অর্থাৎ রফউল ইয়াদাইন-এর হাদিস সম্পর্কে আমীন ওকরভী আবারও তাঁর হাশিয়াহ তাফহীমুল বুখারি আলা সহিহিল বুখারি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮৫-তে লিখেছেন:

«“তবে ইমাম বুখারি এই অধ্যায়ের অধীনে কোনো মুহাজির বা আনসারি সাহাবির কাছ থেকে হাদিস আনেননি। তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছ থেকে একটি রিওয়ায়াত এনেছেন, যিনি অল্পবয়সী ছিলেন অথবা সিগার সাহাবি—অর্থাৎ ছোট সাহাবি—ছিলেন এবং পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন। আর তিনি মালিক ইবনুল হুয়াইরিসের কাছ থেকেও একটি রিওয়ায়াত এনেছেন, যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে মাত্র বিশ রাত অবস্থান করেছিলেন।”»

ওকরভী তাঁর তাজাল্লিয়াতে সাফদার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪-তে আরও লিখেছেন:

«“একইভাবে ইমাম বুখারি কোনো বদরি সাহাবির কাছ থেকে কিছুই বর্ণনা করেননি—অর্থাৎ এমন কোনো সাহাবির কাছ থেকে, যিনি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বরং তিনি শিশুসুলভ ইবনু উমর এবং এমন একজনের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি মাত্র বিশ রাত মেহমান হিসেবে অবস্থান করেছিলেন [মালিক ইবনুল হুয়াইরিস]। তিনি রফউল ইয়াদাইনের হাদিস নয়টি ভিন্ন স্থানে অসম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন।”»

ওয়াইল ইবনু হুজর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ব্যাপারেও আমীন ওকরভী তাঁর তাজাল্লিয়াতে সাফদার, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৪-তে লিখেছেন:

«“ইমাম মুসলিম আরও এক ধাপ এগিয়ে এই দুজন—মালিক ইবনুল হুয়াইরিস এবং আবদুল্লাহ ইবনু উমর—এর সঙ্গে তৃতীয় একজন সাহাবিকেও যুক্ত করেছেন, যিনি ওয়াইল ইবনু হুজর নামে কেবল একজন সফরকারী ছিলেন।”»

এটি দেওবন্দী ইমামের—শুধু ইমাম বুখারি (রহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর আল-জামিউস সহিহ-এর প্রতিই নয়, বরং সাহাবায়ে কেরামের প্রতিও—বিদ্বেষ প্রকাশ করে। তিনি তাঁদের নিয়ে উপহাস করেন, তাঁদের শুধু শিশু হিসেবে উল্লেখ করেন, তাঁদের সঠিক ও নির্ভুলভাবে বর্ণনা না করার কথা বলেন। তাঁর কাছে ব্যাপারটি এমন যেন ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রহিমাহুমাল্লাহ)-এর মতো মুহাদ্দিসগণ শুধু অল্পবয়সী সাহাবিদের কাছ থেকে হাদিস বেছে নিয়েছেন! ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

আমরা প্রশ্ন করি, যদি সাহাবায়ে কেরাম সঠিকভাবে বর্ণনা না করে থাকেন অথবা তাঁরা কেবল এমন ভ্রমণকারী হয়ে থাকেন, যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে অল্প সময় কাটিয়েছেন, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) কি নবী ﷺ-এর সঙ্গে এর চেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছিলেন?

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই একই সাহাবিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাঁদের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন এবং তাঁদের ছাত্রদের রফউল ইয়াদাইন শিক্ষা দিয়েছেন ও নিজেরাও তা আমল করেছেন। অন্ধভাবে তাকলিদকারী হানাফিরা এই তথ্যগুলোর কী করবে?

আর হানাফিরা যে চল্লিশজন আলেমের ‘স্বর্ণকমিটি’র কথা দাবি করে, যারা নাকি হানাফি মাযহাবের মেরুদণ্ড গঠন করেছিলেন—তাঁদের বয়স কত ছিল? তাঁদের কেউ কেউ প্রায় তিন বছরের এবং কেউ পাঁচ বছরের মতো বয়সী ছিলেন। অথচ তাঁদের ওই বয়সেই ফতোয়া প্রদানকারী এবং একটি মাযহাব প্রণয়নকারী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে!

আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ) অথবা তাঁর ছাত্ররা কি ‘বদরি সাহাবি’ ছিলেন?

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর স্মৃতিশক্তি নিয়ে আপত্তি

সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাকার হানাফি ইমাম বদরুদ্দীন আইনি (মৃত্যু ৮৫৫ হিজরি) তাঁর উমদাতুল কারি শরহু সহিহিল বুখারি, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯১-এ “তাকবিরের পর কী বলা হবে”—এই অধ্যায়ের অধীনে লিখেছেন:

«ويحتمل يكون أنس نسى في تلك الحال لكبر سنه وقد وقع مثل هذا كثيرا»

«“সম্ভবত ওই অবস্থায় আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর বৃদ্ধ বয়সের কারণে ভুলে গিয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে।”»
মন্তব্য: সুতরাং লক্ষ করুন, দেওবন্দীরা সাহাবায়ে কেরাম থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণিত রিওয়ায়াতকে পাশ কাটানোর জন্য শুধু তাঁদের ‘শিশু’ বলে অভিহিত করে না—যাঁরা পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন বলে দাবি করা হয়—বরং সাহাবিদের স্মৃতিশক্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁদের ভুলোমনা বলে আখ্যায়িত করে।

অথচ ইমাম মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ১৪২০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, সহিহ বুখারির একটি হাদিসের সনদে থাকা ইয়াহইয়া ইবনু সুলাইম নামের একজন রাবির সমালোচনা করার কারণে আক্রমণের শিকার হন। তিনি সাহাবি ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ)-এর সময়কার একজন রাবি!

বেরেলভি শাইখুল হাদিস গোলাম রাসূল সাঈদী তাঁর শরহু সহিহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৫৪-তে লিখেছেন:

«“সম্ভবত ইমাম দারাকুতনী (রহিমাহুল্লাহ), যিনি ৩৮৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছ থেকে বর্ণনাটি তাঁর বৃদ্ধ বয়সে গ্রহণ করেছিলেন। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বৃদ্ধ বয়সে মানুষ ভুলে যাওয়ার প্রবণতার শিকার হয়।”»

অতএব আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে হাদিসটি হানাফি মাযহাবের বিরোধী, সেটি খণ্ডন করার জন্য হানাফি আলেমরা শুধু সাহাবিদের আদালত-কেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না; বরং তাঁদের দবত-কেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে, নিজেদের মাযহাব রক্ষার জন্য।

এটি যদি সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অবমাননা না হয়, তাহলে আর কী?

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে আল-কাওসারীর বক্তব্য

আবার আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে বিদআতের জন্য প্রসিদ্ধ ব্যক্তি যাহিদ হাসান আল-কাওসারী (মৃত্যু ১৩৭১ হিজরি) তাঁর তানীবুল খতীব, পৃষ্ঠা ৮০-তে এবং আবদুল্লাহ কুদ্দুস খান কারান দেওবন্দীর দ্য আপরাইট ডিফেন্স অব আবু হানিফা, পৃষ্ঠা ২১৩-তে লিখেছেন:

«“এছাড়াও মাথা চূর্ণ করার বর্ণনার ক্ষেত্রে রাবি হলেন একমাত্র আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু), এবং তিনি এটি তাঁর বৃদ্ধ বয়সে বর্ণনা করেছেন। একইভাবে সাহাবিদের উটের প্রস্রাব পান করার বর্ণনাটিও তিনি একাই বর্ণনা করেছেন। আবু হানিফার (রহিমাহুল্লাহ) মত হলো—নিশ্চয়ই সাহাবায়ে কেরাম ন্যায়পরায়ণ [আদিল], কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা মানুষ এবং সাধারণ মানুষ। কখনো কখনো বৃদ্ধ বয়সের কারণে তাঁরা যা শুনেছিলেন তা সংরক্ষণ ও নির্ভুলভাবে বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়তেন। এই দিক থেকে তাঁরা ভুল থেকে মুক্ত নন। এমন কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের বর্ণনা যদি ফিকহের আলেমদের বক্তব্যের বিরোধিতা করে, তাহলে ফিকহের আলেমের বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি যদি বৃদ্ধ বয়সে বর্ণনা করার কারণে ভুল বুঝে থাকেন, তাহলে যে ব্যক্তি তাঁর বিরোধিতা করেন এবং বয়সে তাঁর চেয়ে কম, তাঁর বর্ণনা গ্রহণ করা হবে।”»

এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, হানাফিরা শুধু সেই সাহাবিদের নির্ভুলতাকে আক্রমণ করছে না, যাঁরা আমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছে দিয়েছেন; বরং তারা আরও বলছে যে, সাহাবির বক্তব্য যদি ‘কোনো ফকিহের বক্তব্যের বিরোধী হয়’, তাহলে তা পরিত্যাগ করা হবে। এই বিষয়ে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই—এ বক্তব্য নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।

আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ফকিহ ছিলেন না?

হানাফি ফিকহের ইমাম মোল্লা জিওয়ান (মৃত্যু ১১৩০ হিজরি), যার বক্তব্য আমীন সাফদার ওকরভী তাঁর ফুতুহাতে সাফদার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২-তে উদ্ধৃত করেছেন, আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে লিখেছেন:

«غير معرف ولاجتهاد»

অর্থাৎ:

«“তিনি তাঁর ফিকহ, দ্বীনের বুঝ অথবা ইজতিহাদের জন্য পরিচিত ছিলেন না।”»

ওয়ালিয়াযু বিল্লাহ!

আমীন সাফদার ওকরভী দেওবন্দী তাঁর নিজস্ব ফিকহের গ্রন্থ থেকে এই বক্তব্য উদ্ধৃত করার পরও বলেন:

«“এই বক্তব্যটি এমন লোকেরা ব্যবহার করেছে, যারা দাবি করে যে নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন এবং আমাদের কথা শুনতে পারেন না। আর নির্দিষ্ট একজন মাওলানা ইউনুস নুমানী দেওবন্দী (মৃত্যু ১৪৩৪ হিজরি) যদি নিজেই মিম্বারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতেন যে তাঁর কোনো ফিকহ নেই, অথবা নিজেকে এমন ব্যক্তি বলতেন যে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ নন কিংবা তাঁর কোনো ইজতিহাদ নেই—তাহলে তোমরা তাঁর সম্পর্কে এমন কথা কেন বলবে না, যা একজন সাহাবির ব্যাপারে বলা হচ্ছে?”»

বিতর্ক আরও এগিয়ে যায়। ইউনুস নুমানী, যিনি নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন এবং মানুষের উত্তর শোনেন না—এ মত পোষণ করতেন; তাঁর সমসাময়িক দেওবন্দী আমীন সাফদার ওকরভী, যিনি নবী ﷺ জীবিত এবং শুনতে পারেন—এ মত পোষণ করতেন। ওকরভী তাঁর ফুতুহাতে সাফদার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২-৩৮৩-তে লিখেছেন:

«“প্রিয় ভাইয়েরা! এই বক্তব্যে মাওলানা [সাফদার ওকরভী] বড় ধরনের ভুল করেছেন। তিনি আমার প্রতি এমন কথা আরোপ করেছেন যে, আমি নাকি কোনো সাহাবিকে আদিল মনে করি না; বরং ফাসিক মনে করি। অথচ আমি শুধু নূরুল আনওয়ার থেকে এবং উসূলুশ শাশী থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি। সেখানে যা লেখা আছে, আমি শুধু তা দেখিয়েছি। মাওলানার উচিত ছিল আমাকে জিজ্ঞেস করা—এসব কোথায় লেখা আছে; আমি তাঁকে দেখিয়ে দিতাম। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি এসব বক্তব্য আমার